fbpx

ছাত্র আত্মহত্যা : রুখে দাঁড়াতে হবে এখনই

আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধি। সমাজের দেওয়া অমানুষিক চাপ একটা মানুষকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আত্মহত্যাকে অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্ত‍ু এই আত্মহত্যা কি আসলেই অপমৃত্যু?

সম্ভবত না, কারণ সমাজের ঠেলে দেয়া চাপগুলোই মানুষকে আত্মহত্যা প্রবণ করে তুলে। এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা আশংকাজনক হারে বাড়ছে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার বিগত চার বছরে ব্যপক আকার ধারণ করেছে। চার বছর আগে আত্মহত্যা প্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ছিলো ৩৮ নম্বরে। এখন চার বছর পরে সেটা দশ নম্বরে গিয়ে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা মূলত বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষাগুলোর উপর নির্ভর করে। প্রতিবছর মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গড়ে ১৫০-২০০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মহত্যার সংখ্যাও বেশ দুশ্চিন্তার বিষয়। ২০০৫-২০১৬ পর্যন্ত মোট ১৬ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। আর এবছর শুধুমাত্র এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ করার কারণে শুধুমাত্র কুমিল্লা বোর্ডেই আত্মহত্যা করেছে ১১জন শিক্ষার্থী।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দেশের মোট শিক্ষার্থীর ১৬.৮ শতাংশ আত্মহত্যা প্রবণ !

কেনো এই আত্মহত্যা ?

গবেষণায় দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পিছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী কিছু সামাজিক মূল্যায়ন।আত্মহত্যার কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তা হলো –

  • প্রথমেই পারিবারিক চাপ। আমাদের রক্ষনশীল সমাজ ব্যবস্থার কারনে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছুই তাদের পরিবারের সাথে শেয়ার করতে পারে না। এমন অনেক ব্যাপার থাকে, যেগুলো পরিবার থেকে লুকাতে গিয়ে বে‍ঁচে নেয়া হয় আত্মহত্যার মত নিকৃষ্ট পথ।
  • শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের জন্য দায়ী আমাদের প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থা। একটা পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টকে যখন জীবনের সবকিছু ভাবা হয়, তখন সেটার ব্যর্থতা মানুষকে আত্মহত্যা প্রবণ হিসেবে গড়ে তুলে।
  • জটিলতাপূর্ণ জীবন ব্যবস্থাকে আত্মহত্যার জন্য বড় ফ্যাক্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে কেউ মাদক সেবনের মত অন্ধকার জীবনে নিজেকে টলারেট করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাছাড়া প্রেম ভালবাসায় অপ্রাপ্তিও একজন শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যা প্রবণ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
  • সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ, বা শারীরিক নির্যাতনের মত ঘটনা একজন শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

তাছাড়া পারিবারিক সম্পর্কে কোনো লুপ থাকলে সেটা শিক্ষার্থীদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। নিজেদের একাকীত্বের কারণে তারা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে চায়।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

আত্মহত্যা অবশ্যই একটা ব্যাধি। আত্মহত্যাকে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন পারিবারিক উদারতা, সামাজিক সচেতনতা। পড়ালেখা হতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত। কোনো জোর জবরদস্তি না। পড়ালেখায় মনযোগী করতে হবে ভালবেসে, জ্ঞানের তৃষ্ণা জাগ্রত করে…

আপনি যদি শিক্ষার্থী হন

যদি আপনি শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই আপনাকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। নিজের পড়াশোনার পরিবেশকে আনন্দময় করে গড়ে তুলতে হবে। এমনভাবে নিজেকে মনোযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে রেজাল্ট পরবর্তী কোনো বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। তারপরও যদি রেজাল্ট খারাপ আসে, তবে সেটাকে নিছক দূর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আপনার আশেপাশের কেউ যদি সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্টের চেষ্টা করে, তবে দ্রুত সেটা পরিবারের সাথে শেয়ার করুন। তদুপরি আপনার পরিবারকে আপনার সবচেয়ে কম্পোর্ট জোন হিসেবে গড়ে তুলুন।

যদি অভিভাবক হন

একজন অভিভাবকের দায়িত্ব তার সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। সন্তানকে সেভাবেই বড় করুন, যাতে মনে হয় পরিবারই সন্তানের সবচেয়ে সুখকর ও আরামপ্রদ স্থান। সন্তানের পড়াশোনার নিয়মিত খো‍ঁজ খবর নিন। ঘাটতিগুলো পূরন করার চেষ্টা করুন। তারপরও যদি কাংক্ষিত ফলাফল না আসে, তবে মারধর নয়। প্রয়োজন মানসিক সাপোর্টের। সন্তান যাতে একেবারে ভেঙ্গে না পরে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এই সময়টাতে আপনার নূন্যতম ক্রোধ বা অসাবধানতায়ই ঝরে যেতে পারে আপনার প্রিয় সন্তানটি।

শেষকথা, আমাদের সমাজটা যাতে দুয়েকটা পাবলিক পরীক্ষা নির্ভর না হয়। আমার আপনার ছোটখাট উস্কানিমূলক কথাই পারে একটা পরিবারকে সন্তানহারা করে দিতে।

আর কোনো অকাল মৃত্যু নয়। আত্মহত্যাকে রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময় !

Leave a Reply

error: Content is protected !!