কাজী নিপু, এক অদম্য প্রতিভার গল্প

কাজী নিপু

কাজী নিপু নাম‍টি একটি সাধারণ নাম হলেও এই নামটা এক ধরণের অদ্ভুতত্ব বহন করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফেসবুক নামটা মুখে নিলেই সরাসরি মুখে চলে আসে এই অদ্ভুত নামটি। কি আছে রহস্য এই নামের মধ্যে?

হ্যাঁ রহস্য অনেক আছে, কেননা এই নামের পিছনে যে মানুষটি বসে আছেন, নামের মূল অদ্ভুতত্ব তিনিই বহন করেন। তিনি কোনো জাদুকর নন, কিংবা আলৌকিক শক্তির অধিকারী নন। তিনি আর পাঁচজনের মতই সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু তার এই সাধারণ মানুষ বেশে লুকিয়ে আছে অসাধারণ কিছু মেধা ও গুণাবলী। কথায় আছে না, নামে ‍কি আসে যায়, গুণেই পরিচয় ! তার বেলায় ঠিক এরকমটাই ঘটেছে। তার এই নামটা অতি সাধারণ নামের একটি হলেও তার অসাধারণ কিছু গুণাবলীর কারণে নামটি অসাধারণ রূপ ধারন করে বসে আছে।

আচ্ছা, কে এই নিপু? জানা যাক তার সম্পর্কে একটু !

নিশান জামান থেকেই শুরু কাজী নিপুর উত্থান ! নিশান জামানের ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করে উঠে আসে শুধু একটিই বাক্য, তা হলো সর্বসাধারণ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন মিউজিক কম্পোজার। কিন্তু স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে কোনো পেশায়ই নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি তিনি। তার মতে, তার কোনো পেশা নেই। তিনি যা করেন, সবই শখের বশে করেন ! আর এটাই তার সবচেয়ে মজার পরিচয়, যার কারণে ভক্তরা তাকে এত ভালোবাসে !

একজন মানুষ যে দুই চরিত্রে ফুটে উঠতে পারে, তা এই আলোচ্য ব্যক্তির জীবনী পর্যালোচনা করলেই সামনে চলে আসে। তিনি নিজেকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে আরো বুঝিয়ে দিলেন যে ব্যক্তিগত লাইফ আর ভার্চুয়াল লাইফের পার্থক্যটা কোথায় ! একজন মানুষ ভার্চুয়াল জগতে নিজেকে বহুরূপী প্রমান করতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তা কখনোই সম্ভব নয়, সে একজনই।

কাজী নিপু (ছদ্মনাম), এই নামটা বর্তমান সময়ের পরিচিত একটি নাম। একটা সময় পুরো ভার্চুয়াল জগতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছে এই নামটি। সময়ের প্রয়োজনে কাজী নিপু তৈরি করেছিলেন ‘পাগলা গ্রুপ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। এই গ্রুপের মাধ্যমে উগ্র নাস্তিক্যবাদ ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ‘পাগলা গ্রুপ’ এর সাথে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন নিজের পরিচয় গোপন রাখা কাজী নিপু নামধারী এই মানুষটি। এই অদ্ভুত মানুষের সেই গ্রুপের শুরুটাও হয়েছিলো বেশ অদ্ভুতভাবে।

খুব সম্ভবত ২০০৯ এর মাঝামাঝি দিকে, রোবায়াত খান নামে তার এক ফেসবুক ফ্রেন্ডের ফ্যামেলি ফটোতে কিছু ছেলে জঘন্যভাবে গালাগাল দিচ্ছিলো এবং ওই ফ্রেন্ডের ওয়াইফের ছবি নিয়েও নোংরামি করছিলো। সেসময় রোবায়াত খানের লিস্টের কয়েকজন মিলে একসাথে তাদের পাশে দাঁড়ায়। এবং সেসকল নোংরামির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়। সেখান থেকেই শুরু হয় পাগলা গ্রুপ। এই গ্রুপের কাজগুলো ছিলো অসাধারণ। আমরা যারা প্রথমদিকের ফেসবুক ইউজার, তারা কমবেশ সবাই জানি ওই সময়টা ফেসবুকে ব্যাপক উগ্রবাদ ও নাস্তিক্যবাদ চলছিলো। তো এই গ্রুপটা প্রথমে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে মাঠে নামে। আস্তে আস্তে মুক্তচিন্তাকে স্বাগত জানিয়ে উগ্র নাস্তিক্যবাদের প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। ফেসবুক থেকে নাস্তিকদের বেশ কয়েকটি বড় পেজ ও গ্রুপ ব্যান করে দিয়ে তারা সবার আলোচনায় আসে। বন্ধ হয় ধর্মকামী ব্লগ সহ ফেসবুকে সাদিয়া সুমি উজ্জা, আসিফ মহিউদ্দিন, নাস্তিক নবী সহ কয়েকটি বড় বড় ধর্ম অবমাননাকারী প্লাটফর্ম। এরপরই শুরু হয় অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এবং ওইসময়টাতে পাগলা গ্রুপের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় ফেসবুকে ব্যপক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আরিফ আর হোসেন।

গ্রুপের পাশাপাশি ছিলো কাজী নিপুর স্বপ্নের প্রজেক্ট ছারপোকা বাস্তবায়নের লক্ষ্য। প্রজেক্ট ছারপোকার অঙ্গীকার ছিল তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পথ চলা। তরুণদের নিয়েই ছিলো তার এই প্রজেক্ট। ২০১৪ তে এই প্রজেক্টের কাজ ছিলো ছোটখাট সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা, যেগুলো আম‍াদের তরুণ প্রজন্মরা নিজেরাই করতে পারে। ছারপোকার আরো কাজ ছিলো তরুণদের দিয়ে ভালো কিছু করানো। যেমন, পুরো দেশের ৬৪ জেলায় তাদের ৬৪০ জনেরও বেশি দুর্লভ ব্লাড গ্রুপের ডোনার ছিলো। যখন যেখানে যেকোনো মুহুর্তে দুর্লভ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হলে সেখানেই ওই এলাকার বা আশেপাশের কাউকে পাঠিয়ে রক্তদান সম্পূর্ন করা হত। ভিন্নধর্মী ছারপোকার সদস্যরা নিজেরা কাপড় কিনে পথশিশুদের হাতে পৌঁছে দিত। ‍আলাদাভাবে কোনো ফান্ড রেইজ করা হত না ছারপোকার জন্য। ছারপোকার সদস্যরা নিজখরচে কাপড় কিনে দুস্থদের হাতে পৌঁছে দিয়ে প্রমাণস্বরূপ একটি ছবি তুলে গ্রুপে পোস্ট দিত। যা দেখে আরো মানুষ অনুপ্রেরিত হয়। এবং এভাবেই বাড়তে থাকে ছারপোকার জনপ্রিয়তা।

জানা যায়, কাজী নিপুর মিশন সেভলাইভ টিমের আন্ডারেই কাজ করত প্রায় ১,৬০০ তরুণী ! একজন তরুণ হয়েও এত সংখ্যক অপরিচিত তরুণীদের লিডার হওয়া বা লিড দেওয়া মুখের কথা নয়। যেখানে একটা মেয়ে পটাতেই আমরা হিমশিম খাই (😜)

তৎকালীন কাজী নিপুর অনন্য গুনাবলীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফেসবুক পেইজ ভেরিফাইড করা, এক ফোনে দুই নাম্বারের ওয়্যাটস্যাপ চালানোর মত অসাধারণ কিছুঅনেক কৃতিত্ব। ২০১২ সালে ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক ‍জুকারবার্গ একটি স্ট্যাটাস দেয়ার মাত্র ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে সেটি ডিলেট করে দেখানোর মাধ্যমে কাজী নিপু প্রথম টেকজগতে আলোচনায় আসেন। তবে তিনি আরো বেশি আলোচনায় আসেন বাংলাদেশি ক্রিকেটার ও টিভি মিডিয়াগুলোর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ ভেরিফাই করার মাধ্যমে। এর ফলশ্রুতিতে মাত্র ২১ লাইক নিয়ে কাজী নিপুর নিজস্ব পেজটিও (Kazi Nipu) ফেসবুক কতৃপক্ষ ভেরিফাইড করে দেয়। সম্প্রতি তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ১ লক্ষ ফ্যান সীমা পূর্ন করেছে।

এসব কিছুর পিছনে কাজী নিপুর আরেকটি বড় পরিচয়, সে পরোপকারী। আর এই পরোপাকারীতার জন্য তার পোহাতে হয়েছে বহু ঝামেলা। এই ঝামেলার মাধ্যমে নানান সমালোচনায় প্রচুর পরিমাণে সমোলোচিতও হয়েছেন তিনি বহুবার।

হঠাৎ করে কোনো মেয়েকে যদি কোনো ছেলে ফেসবুকে উত্যক্ত করত, তার বিরুদ্ধে রুখে দ‍াঁড়াতেন এই কাজী নিপু ও তার পুরো দলবল। যার ফলে বহুবিধ ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। বানিয়েছেন নিজের হাজারো শত্রু। শত ঝামেলাতে জড়িয়েও কখনো নিজেকে উন্মোচন করেননি তিনি, কখনো বুঝতেও দেননি কে সেই কাজী নিপু !

যদি একপর্যায়ে ভক্তরা ঠিকই বুঝে নিয়েছে ব্যান্ড ছারপোকার সেই নিশান জামানই হচ্ছেন কাজী নিপু। যে কিনা পর্দার আড়ালে থেকে রাজত্ব করে যাচ্ছেন বিশাল এক ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যের ! ছারপোকা নামটি ব্যবহারের কারণেই এ পরিচয় সামনে এসেছে বল‍া হয়ে থাকে।

কাজী নিপু সবসময় গা-ছাড়া ভাব নিয়ে থাকেন। তার এই গা-ছাড়া ভাবের কারণেই ‍তার ছদ্মনামটা ব্যবহারের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বহু জায়গাতে বহু মানুষ প্রতারনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার ভক্ত ও শুভাকাঙ্খীরা তা বেশি দূর যেতে দেয়নি। কারণ তিনি এক অদ্ভুত ভালোবাসার মায়াজালে সবাইকে ধরে রেখেছেন এবং বিশ্বাস জাগিয়ে রেখেছেন যে, যতদিন চলবে এই ভার্চুয়াল সাম্রাজ্য, ততদিন একটি নামই থাকবে সবার উপরে, আর তা হচ্ছে “কাজী নিপু” !

জানিনা এই লেখাটি মডারেট হবে কিনা। কারণ যে ছারপোকা ম্যাগাজিনে এসে কাজী নিপুর গুণগাণ করছি, সেই প্লাটফর্মটাও তারই সৃষ্টি !

Comments

comments