একজন বেসবাবা এবং অর্থহীনের গল্প !

বেসবাবা

বেসবাবা সুমন, বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড অর্থহীনের প্রতিষ্ঠাতা এবং দলনেতা। তিনি মূলত গায়ক এবং বেস গীটার বাজিয়ে থাকেন। তবে কখনো কখনো তাকে একোস্টিক গীটার কিংবা কী-বোর্ড হাতেও দেখা যায়। তার পুরো নাম সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন। সুমনের জন্ম তারিখ ৮ জানুয়ারি ১৯৭৩। সঙ্গীত জগতে সুমন বেস-বাবা নামে খুব বেশি পরিচিত।

বেজবাবা সুমন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা থেকে ১৯৯০ সালে এস. এস. সি পরীক্ষা দেন, সঙ্গীতের প্রতি এত টান ছিল যে তিনি এসএসসির পরই সংগীতের জগতে প্রবেশ করেন।

বেসবাবা’র সঙ্গীত জীবন ও অর্থহীনের গড়ে উঠা

বাংলাদেশে ব্যান্ড গুলোরে মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড হলো অর্থহীন। এই ব্যান্ডের শুরুটা হয় ব্যান্ডের কর্নধার বেজবাবা সুমন এর হাত ধরে ঠিক যখন তার ৭ বছর বয়স। এই ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং দলনেতা হচ্ছে বেজবাবা সুমন।তার মা তাকে একটি হাওয়াইয়ান গিটার উপহার দিয়েছিল, কে জানতো এই গীটারের মাতাল করা সুর দিয়েই এক ইতিহাস রচনা হবে? ১৯৯০ এর দিকে গভঃ ল্যাব থেকে এসএসসি পাস করে বের হতে না হতেই প্রতিষ্ঠা করেন দুইটি ব্যান্ড।

১৯৮৬ সালে সুমন তার রক সংগীতের জীবন শুরু করেন।সেই বছরই সুমন ‘ফ্রিকোয়েন্সি’ নামের একটি ব্যান্ড গঠন করেন। ১৯৯০ সালে ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডে সুমন বেস গীটার বাজাতেন। সে বছর সুমনের তার ব্যান্ডের নাম বদলে ‘রক ফ্যান্টম’ রাখেন। ‘সাইল্যান্স’ ব্যান্ডে সুমন লীড গীটারিস্ট হিসেবে যোগ দেন। এর কয়েকদিন পর তিনি ‘ফিলিংস’ -এ বেস গীটারবাদক হিসেব বাজানো শুরু করেন। এলাকার স্টুডিওতে বেস গীটারবাদক হিসেবে বাজানো শুরূ করেন। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেইজ, ইন ঢাকা, সুইট ভেনম, রক ব্রিগেডে বেস গীটারবাদক হিসেবে বাজান। সেই বছরই তার প্রথম অ্যালবাম ‘সুমন অর্থহীন’-এর কাজ শুরু করেন।

হঠাৎ ১৯৯৩ সালে সুমন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিলিংস ত্যাগ করেন। তিনি একক অ্যালবাম করার পরিকল্পনা করেন। তার ইচ্ছা ছিল ভিন্ন ধারার গান করার। তিনি এমনভাবে একক গান করা শুরু করেন যাতে ব্যান্ডের পরিবেশটা একক গানেও বজায় থাকে। তিনি ফায়সাল এবং রাসেলের সাথে তার প্রথম গান করেন। তার গানে ড্রাম বাজিয়েছিল রুমি। ১৯৯৪ সালে ‘জলি রজার’ ত্যাগ করেন। এবং ১৯৯৫ সালে ‘শব্দ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন এবং এই ব্যান্ড থেকে কিছু গান রেকর্ডিং-এর কাজ শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে ‘শব্দ’ ব্যান্ডটি ভেঙে যায়। সুমন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেইজে’ যোগদান করেন। ১৯৯৭ সালে ওয়ারফেইজের চতুর্থ এলবাম ‘অসামাজিক’-এর কাজ শুরু হয়। জি-সিরিজ থেকে সুমনের প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুমন ও অর্থহীন’ প্রকাশিত হয়। অ্যালবামটি ব্যপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। সমালোচকরাও নতুন ধারার এই গানটির প্রশংসা করেন।

১৯৯৮ সালে মনমত নতুন একটি দল গঠন করার পরিকল্পনা করেন। ‘ফেইথ’ ব্যান্ডের টিটি ও সেন্টু তার পরিকল্পনায় সহায়তা করে। আরো কয়েকজন সংগীতশিল্পীকে নিয়ে সুমন ‘সুমন ও অর্থহীন’ নাম দিয়ে ব্যান্ডের কার্যক্রম শুরু করেন। এবং সুমন ১৯৯৯ সালে ওয়ারফেইজ ত্যাগ করেন। সেই বছরই ব্যান্ডের নাম ঠিক হয় ‘অর্থহীন’। ২০০০ সালে অর্থহীনের প্রথম অ্যালবাম ‘ত্রিমাত্রিক’ প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামটির জনপ্রিয়তা এত ব্যাপক ছিল যে সুমনের নাম ওয়ারউইকের ‘ফেমাস ইউসার লিস্ট’-এ লিপিবদ্ধ হয়। তিনি প্রথম এশিয়ান সংগীতশিল্পী হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। ২০০১ সালে অর্থহীনের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘বিবর্তন’ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য আছে যে, বিবর্তন বাংলাদেশের ব্যান্ডসঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসা সফল অ্যালবাম।

২০০২ সালে অর্থহীনের তৃতীয় অ্যালবাম ‘নতুন দিনের মিছিলে’ প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামে রয়েছে ‘সাতদিন’ নামের ২৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ড এর একটি গান। এটি বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে দীর্ঘতম গান। একই বছরে সুমনের দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘স্বপ্নগুলো তোমার মত’ প্রকাশিত হয়।২০০৩ সালে অর্থহীনের চতুর্থ এলবাম ‘ধ্রুবক’ প্রকাশিত হয়। তারপরই সুমন অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুমন আগের মত আর গান করতে পারবেন না বলেও শঙ্কা দেখা দেয়। এরপর থেকে সুমন মেটাল সঙ্গীত গাওয়া কমিয়ে দেন। ২০০৪ সালে সুমনের অসুস্থতার কারণে ব্যান্ডের প্রায় সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এই বছরই সুমন এম.টি.ডির (মাইকেল টবিয়াস ডিজাইন) অধিভুক্ত হন। ২০০৫ সালে মনের চোয়ালের হাড়ে মারাত্নক সমস্যা দেয়। চিকিৎসক বলেন যে, সুমনের আগের মত গান করতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। অর্থহীনের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সুমন এবং বাকী সদস্যরা অর্থহীন ভেঙ্গে দেয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই সুমন সুস্থ হয়ে উঠতে থাকেন। সুমন আবার গান গাওয়া শুরু করেন। এ বছর সুমন জন ডেনভারের গানের অনুবাদ করে ‘মেঘের দেশে’ নামের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন।২০০৭সালে সুমনের তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘বোকা মানুষটা’ প্রকাশিত হয়।

অর্থহীনের বর্তমান সদস্য যারা :

  • বেজবাবা সুমন – ভোকাল, বেস গিটার, লিরিসিস্ট (শুরু – বর্তমান)
  • শিশির আহমেদ – লিড গিটার, কি-বোর্ড (২০০৩ – বর্তমান)
  • মার্ক ডন – ড্রামস, গিটার, ব্যাক ভোকাল (২০১৫ – বর্তমান)

অর্থহীন ব্যান্ডের প্রথম লাইনআপে যারা ছিলেন :

  • সুমন (গায়ক, বেজ গিটারিস্ট,লিরিসিস্ট)
  • টিটি (ড্রামার)
  • সেন্টু (বেস গিটারিস্ট)
  • যুবায়ের (বাঁশি)
  • তন্ময় (গিটারিস্ট)
  • আদনান (পারকিউশন)

অর্থহীন ব্যান্ড থেকে যে সদস্যবৃন্দ চলে গিয়েছে তারা হলো –

  • টিটি (ড্রামার)
  • সেন্টু (বেস গিটারিস্ট)
  • যুবায়ের (বাঁশি বাদক)
  • আদনান (পারকিউশন)
  • তন্ময় (গিটারিস্ট)
  • কমল (লিড গীটার গিটারিস্ট)
  • রাফা (ড্রামার,ভোকাল)

সাধারণত অর্থহীন ব্যান্ডটি রক ব্যান্ড হলেও তারা এখন হেভি মেটাল গানও করে যাচ্ছে খুব সাবলীল ভাবে। তারা গত ১৮ বছরে অর্থহীন রিলিজ করেছে সর্বমোট ৭ টি স্টুডিও অ্যালবাম। অর্থহীন ব্যান্ডের শুরু থেকে এই পর্যন্ত সর্বমোট নয়বার তাদের লাইন আপ চ্যাঞ্জ হয়েছে।তারপর ও ব্যান্ডটি থেমে থাকে নি। তার কারণ হলো ব্যান্ডটি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো একজন আর তিনি হচ্ছেন বেজবাবা। তার কারণেই এখনো টিকে আছে ব্যান্ডটি।

অর্থহীনই হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যান্ড যারা বাংলাদেশে সিরিজ সঙ্গীতকে পরিচিত করে তুলেছেন সকলের কাছে। অর্থহীন ব্যান্ড এই পর্যন্ত অনেক গুলো সিরিজ সঙ্গীত বের করেছে এবং এখনো সেই ধারায় অব্যাহত রেখেছেন। তাদের করা সিরিজ সঙ্গীত গুলো তাদের ভক্তদের কাছে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। তাদের সিরিজ সঙ্গীত গুলো হলো অদ্ভুত সেই ছেলেটি, গুটি, নিকৃষ্ট, সুর্য, অত্তহনন, আনমনে। আর এই সিরিজ সঙ্গীত গুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয় সকলের কাছে। এবং এই গুলোই তাদের বিখ্যাত সিরিজ সঙ্গীত। এছাড়াও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দৈর্ঘ্যের গান রচনা করার রেকর্ডটিও রয়েছে অর্থহীনের দখলে । সেই গানটির নাম হচ্ছে ‘সাত দিন’।এই গানটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৮ঃ৩২ মিনিট। এই গানটি মূলত তৈরী করা হয়েছিল ফাঁসীর সাজাপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যুর আগের ৭দিনের বর্ননা দেয়ার মাধ্যমে। এই গানটি ও তাদের ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে।

সুমনের গানের জগতে প্রেরণা যুগিয়েছেন যারা

সুমনের সঙ্গীত জীবনে অনেক গায়ক কিংবা ব্যান্ড সুমনের সঙ্গীত জীবনে পরোক্ষ প্রেরণা যুগিয়েছেন। সুমনের গানে তাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে আছে – বিলি শিহান, বিভের ফেলটন, ভিক্টর উটেন, ফ্রান্সিস রক্কো, প্রেস্টিয়াস্টু হাম, স্টিং, মেটালিকা, মেগাডেথ, জন ডেনভার, ড্যান সিলস, দ্য কোরস, আইরন মেইডেন ইত্যাদি খ্যাতিসস্পূর্ন গায়ক ও ব্যান্ড।

সুমন এর ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র

এম.টি.ডি. (মাইকেল টোবিয়াস ডিজাইন) ৫ তারের বেস (মাইকেল টোবিয়াস সুমনের জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি করে দেন), ক্র্যাফট ৫ তারের সেমি-একস্টিক বেস, ভেরিএক্স একোস্টিক ৭০০, লাইন ৬ বেস পড এক্সটি লাইভ, এসডব্লিঊআর সুপার রেডহেড, ইয়ামাহা বেস সিন্থেসাইজার, বেস ভলিউম পেডেল।

সুমনের প্রাক্তন ব্যান্ড ও সময়কাল

  • রক ফ্যান্টম (১৯৮৬-১৯৯২)
  • সাইলেন্স (১৯৯০-১৯৯২)
  • ফিলিংস (১৯৯০-১৯৯৩)
  • জলি রজার (১৯৯৩-১৯৯৪)
  • এসিস (১৯৯৩-১৯৯৪)
  • শব্দ (১৯৯৫-১৯৯৬)
  • ওয়ারফেইজ (১৯৯৬-১৯৯৯)

অর্থহীন ব্যান্ডের প্রকাশিত ৭ টি অ্যালবাম এর নাম :

  1. ত্রিমাত্রিক (২০০০)
  2. বিবর্তন (২০০১)
  3. নতুন দিনের মিছিলে (২০০২)
  4. ধ্রুবক (২০০৩)
  5. অসমাপ্ত – ১ (২০০৮)
  6. অসমাপ্ত – ২ (২০১১)
  7. ক্যানসারের নিশিকাব্য (২০১৬) ও একটি অ্যালবাম রয়েছে ওয়ারফেজের হয়ে ১৯৯৮সালে ‘অসামাজিক’।

সুমনের প্রকাশিত একক অ্যালবাম ও প্রকাশের বছরঃ

  • সুমন ও অর্থহীন (১৯৯৭)
  • কখনো (১৯৯৯)
  • যদি কভু (১৯৯৯)
  • একটু ঘুম (রক উইথ রেডিও ম্যানিয়া)
  • ওলটপালট (বাপ্পা উইথ রকারস)
  • স্বপ্নগুলো তোমার মত (২০০২)
  • মেঘের দেশে (২০০৫)
  • বোকা মানুষটা (২০০৭)
  • আজ এসেছি (২০১১)
  • প্রতিচ্ছবি (২০১২)
  • চাঁদর (২০১৩)
  • আমজনতা (২০১৩)
  • সউল ফুড পার্ট ওয়ান (ইন্সট্রুমেন্টাল অ্যালবাম) (২০১৬)

অন্যান্য গানের মধ্যে রয়েছে ফুয়াদ ফিচারিং “এখন আমি” (সুমন ও আনিলা) ২০০৭ ৷

এছাড়াও অর্থহীন বেশ কিছু সিঙ্গেল গান প্রকাশ করেছিল, সেগুলো হলো : আত্মহনন ১, সূর্য ১, অতীত, A.O.D, বয়স, যুদ্ধ, এপিটাফ, ইতিহাস, প্রতিরূপ, আত্মহনন২, নির্বোধ, আমজনতা ইত্যাদি।

এছাড়াও অর্থহীন কিছু গান কভার করেছিল, তারমধ্যে ভালো ছিল – লোকে বলে, মাটির পিঞ্জিরা, একদিন তোর হইব রে মরণ ইত্যাদি।

অর্থহীনের সেরা ৫০ টি গানের তালিকা

  1. অসমাপ্ত
  2. চাইতে পারো
  3. আনমনে
  4. যদি কোনোদিন
  5. বিজয়ের গান
  6. আনমনে ২
  7. শেষ গান
  8. সূর্য
  9. রাতের ট্রেন
  10. যদি
  11. নির্বোধ
  12. আবার
  13. নিকৃষ্ট
  14. মরীচিকা
  15. গল্প শেষে
  16. আমার প্রতিচ্ছবি
  17. রংধনু
  18. গুটি (দা ফিনালে)
  19. ছেড়া স্বপ্ন
  20. উড়ু উড়ু মন
  21. চাইতে পারো ২০০৮
  22. সমাধি শহর
  23. ইতিহাস
  24. হয়তোবা
  25. আমার ক্লান্তি
  26. আমজনতা
  27. ক্যান্সার
  28. গুটি
  29. কল্পনা
  30. চাইতে পারো ২
  31. ঘুম
  32. আনমনেই
  33. আকাশের তারা
  34. বয়স
  35. কৃষ্ণচূড়া
  36. ভাবছি বসে
  37. তুমি
  38. মাঝে মাঝে
  39. গুটি
  40. আনমনে
  41. এপিটাফ
  42. ছেঁড়া স্বপ্ন
  43. আলো আর আঁধার
  44. নীল পাহাড়
  45. সাগর ও একটি ছেলে
  46. চাইতে পারো (২০০৮)
  47. গল্পের শুরু (অদ্ভুত সেই ছেলেটি)
  48. কাঁদবে বিস্ময়ে
  49. চাইতে পারো ২
  50. নিকৃষ্ট ২

বেজবাবা সুমন হচ্ছে হার না মানা একজন সৈনিকের নাম, যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়েও বাধা-বিপত্তিকে মধ্যাঙ্গুলী দেখিয়ে বের হয়ে হয়ে এসেছে বারবার।

তিনি ২০১৭ সালের তার জীবনের রিভিউস্বরুপ একটি পোস্ট আপডেট করেছেন। পোস্টটি নিচে হুবুহ তুলে দেয়া হয়েছে। এর মাঝেই বুঝা যায় একট‍া মানুষ জীবনে কতটা সংগ্রাম করে বেঁচে থেকেও নিজের প্যাসন থেকে এক পাও পিছু হটেনি। এরজন্য নিঃসন্দেহে বলা যায়, বেসবাবা একজন হার না মানা লড়াকু সৈনিক !

তার দেয়া ইয়ার রিভিউ পোস্টটি :

জানুয়ারিঃ হেলথ চেক আপ এর জন্য ব্যাঙ্কক যাই। ডাক্তার ব্লাড টেস্ট করার পর বলে আমার কোলেস্টেরোল লেভেল অনেক হাই। অষুধ দেয়।

ফেব্রুয়ারিঃ শরীর খারাপের দিকে যায়। ঘুম বন্ধ। ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করি। সারাদিন মনে হয় একটা ঘোরের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি! পেটেও ব্যাথা বাড়তে থাকে কোন এক কারণে।

মার্চঃ অবস্থার আরো অবনতি হয়। হেলুসিনেশন শুরু হয়। সিঙ্গাপুরে যাই সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার সমস্যাটা বের করে। ব্যাঙ্ককের ডাক্তার কোলেস্টেরোলের অষূধ দিতে গিয়ে ‘ভুলে’ এপিল্পসির অষূধ দেয়! আমি গত দুমাস এপিলেপ্সির অশুধ খেয়ে দিন কাটিয়েছি! ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সাথে সাথে অষূধ বন্ধ করি। ব্যাংকক এ যাই আবার। স্পাইন এর ডাক্তার বলে আমার সারভিকাল স্পাইন এর অবস্থা অনেক খারাপ। যেকনো সময় প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে পুরো শরীর! সাথে সাথে সার্জারি করাই। ডাক্তার আমার স্পাইনে ৩ টা স্ক্র্যু বসায়।

এপ্রিলঃ পেটে প্রচণ্ড ব্যাথা। কিছু খেতে পারিনা। বমি হয়ে যায়।ব্যাংককের ডাক্তার বলে এটা এসিফিউগাল ক্যানসারের পূর্বাভাস! আরেকটা সার্জারি হয়। স্টমাক পুরোপুরি ভাবে কেটে ফেলে দেয়া হয়।

মেঃ লোয়ার ব্যাক এ অসম্ভব পেইন। হাঁটাচলা করতে পারিনা ঠিকমত। সুতরাং আবার সার্জারি। ডাক্তার এবার আরও চারটা স্ক্র্যু বসায় স্পাইনে। সর্বমোট এখন আমার শরীরে ৭ টা স্ক্র্যু!

জুনঃ ব্যাথার সাথে বসবাস।

জুলাইঃ কোন এক কারণে ব্যাথা কমে না। বরং একটু বেশি ব্যাথা অনুভব করি। থুতনিতে একটা টিউমার হয়।

অগাস্টঃ থুতনির টিউমার অপসারণের জন্য সার্জারিতে ঢুকি ব্যাংককে। ডে সার্জারি। বিকালে হসপিটাল থেকে বিদায় নেই। রাস্তা পার হবার সময় একটা গাড়ি ধাক্কা দেয়। জ্ঞান হারাই। পাশের হসপিটালে ১১ ঘণ্টা ব্যাপী ৯ টা সার্জারি হয় আমার।

সেপ্টেম্বরঃ আবার স্পাইনে সার্জারি! নিচের চারটা স্ক্র্যু খুলে ডাক্তার আরও ৮ টা স্ক্র্যু বসায়। সর্বমোট শরীরে এখন ওরা এগারো জন! সার্জারি চলাকালীন সমস্যা হয়। অ্যানাস্থেশিয়ার ভুল ডোসেজের কারণে আমার হার্ট বন্ধ হয়ে যায়। তারা আমাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনে। সার্জারির পর আইসিইউ তে নিয়ে যাবার ১ ঘণ্টার মধ্যে আমার লাং কলাপ্স করে। পুনরায় মরতে মরতে বেঁচে যাই।

অক্টোবরঃ অসম্ভব কষ্ট এবং ব্যাথায় দিন কাটাই।

নভেম্বরঃ ব্যাথা দিন দিন বাড়তে থাকে। পেইনকিলার ইনজেকশন নিতে হয় একদিন পর পর। ব্যাংককে ৪টা ডাক্তার দেখাই কিন্তু পেইন কমে না। এর মাঝে সিডনিতে শো করে আসি।

ডিসেম্বরঃ সিঙ্গাপুরে যাই। সিঙ্গাপুরের ডাক্তার আমার সব ওষুধ চেঞ্জ করে দেয়। ব্যাথা কমা শুরু হয়। কনসার্ট করার জন্য প্রস্তুতি নেই। আবার রেকর্ডিং শুরু করি।

২০১৮, তুমি আসো। আমি রেডি !

অনেক অনেক শুভকামনা বেসবাবা ও অর্থহীনের জন্য…

Comments

comments

SHARE