fbpx

১৯৩০ : ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম মঞ্চ

নানা রং-বেরঙের জমকালো আয়োজনে প্রতি চার বছর পর পর ফুটবল বিশ্বকাপের পর্দা উঠে। শুধুমাত্র অংশগ্রহণ করা দেশ গুলোই নয়, মেতে উঠে পুরো বিশ্ব একই মঞ্চে। তবে সকল বিশ্ব প্রতিযোগিতার উন্মোচন হবার একটা ইতিহাস থাকে। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। ফুটবল খেলায় তখন আলাদা বড় টুর্নামেন্ট ছিল না। অলিম্পিকের আসরে অন্যান্য খেলার সাথে ফুটবল ছিল একটি। অলিম্পিক কমিটি থেকে হঠাৎ ঘোষণা আসে ১৯৩২ সালের অলিম্পিকে থাকছেনা ফুটবল খেলার ইভেন্ট। ফুটবল যখন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ঠিক সেসময় এমন সিদ্ধান্ত হয়ত ফিফার চোখ বড় করে দিয়েছিল।

১৯৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের পোস্টার

১৯৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের পোস্টার

১৯৩০ ফুটবল বিশ্বকাপের পোস্টারফিফা প্রেসিডেন্ট মঁসিয়ে জুলে রিমে’র হাতে ধরে ১৯০৪ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জন্ম নেয় ফিফা (ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ডি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন)। তখন থেকেই অলিম্পিকের সঙ্গে একটা স্নায়ুর দ্বন্দ্ব বরাবরই ছিল ফিফার। সে সূত্র থেকেই ফুটবলের উপর কড়া চোখে দেখা শুরু করে অলিম্পিক কমিটি। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ফুটবলকে খেলার সাথে যোগ্যই মনে করতো না৷ ১৯০০ এবং ১৯০৪ সালে ফুটবল নামক একটি ইভেন্ট নামে মাত্র রাখা হয়, সেখানে খেলোয়াড়দের কোনো পদক প্রদান করেনি। ১৯০৪ সালে বৈশ্বিক ফিফা গঠন করা হলে অলিম্পিক কমিটির সাথে স্নায়ু দ্বন্দ্ব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতিকূলে হয়ে উঠেনি বড় কোনো আসর বসানোর। যাইহোক, অলিম্পিক থেকে বেরিয়ে এসে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিতে থাকে ফিফা প্রেসিডেন্ট। অবশেষে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে প্রস্তুতি নিয়ে পেলে ফিফা।

ইস্টাডিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়াম

প্রায় এক লক্ষ দর্শকে ফাইনাল ম্যাচে ইস্টাডিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়াম

বিশ্বকাপের অভিষেক আসর আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করে অনেক দেশ। বিশেষ করে যাদের নেতৃত্বে ফিফা গঠিত হয় সেই ফ্রান্সের আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। তার উপরে ফিফার সভাপতি ফ্রান্সের মঁশিয় জুলে রিমে। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজনের দায়িত্ব যে ফরাসীরা পাচ্ছে এটা অনেকে এক রকম ধরেই নিয়েছিল। কিন্তু সবার ধারণার সাথে বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ফিফার ৪১টি দেশের প্রতিনিধির বৈঠকে প্রথম আয়োজক নিয়ে মতানৈক্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতে যেতে হয় ফিফা সভাপতিকে। ভোটের ফলাফল ফ্রান্স কেন, ইউরোপের কোন দেশের পক্ষেই গেল না। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়লো সুদূর ল্যাটিন দেশ উরুগুয়ের পক্ষে। যদিও তার যথেষ্ট কারণও ছিল। কেননা তখন উরুগুয়ের ফুটবলে স্বর্ণযুগ। এর আগের দুটো অলিম্পিকে (১৯২৪ ও ’২৮) ফুটবলের সোনা জিতেছে তারা। এ ছাড়া ১৯৩০ সাল উরুগুয়ের স্বাধীনতারশতবর্ষ। তাদের স্বাধীনতার শতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে চায় বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। এ জন্য তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুওলোর যাবতীয় খরচও বহন করতে সম্মত হয়। এছাড়াও মন্টিভিডিওতে একটি প্রায় এক লাখ আসনের নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে উরুগুয়েকে হটিয়ে অন্য কারো পক্ষে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগই ছিল না। তাই বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজক দেশ হিসেবে ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে সবুজ সংকেত পেয়ে যায় উরুগুয়ে।

ফ্রান্স দল বিশ্বকাপে যোগ দিতে জাহাজে

স্বাগতিক দেশ হতে না পেরে ভালোই চটেছিল ইউরোপের দেশগুলো। দূরত্বের অজুহাত দেখিয়ে ইউরোপ থেকে মাত্র চারটি দেশ (ফ্রান্স, বেলজিয়াম, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া) বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে উরুগুয়ে পাড়ি জমাতে রাজি হয়। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে রোমানিয়ার রাজা ক্যারল ছিলেন অনবদ্য। নিজ দেশকে যেন মাঠে নেমেই সাহস দিয়েছিল এবং অন্যান্য দেশকে উৎসাহিত করেছে অংশগ্রহণ করতে। ১৯৫০ সালের আগে বিশ্বকাপ ফুটবল কে যেন প্রতিযোগিতামূলক খেলাই মনে করতো না ইংল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকা থেকে ৭টি, ইউরোপ থেকে ৪টি এবং উত্তর আমেরিকা থেকে ২টিসহ মোট ১৩টি দেশ অংশ নেয় প্রথম বিশ্বকাপে। উরুগুয়ের শত অনুরোধ এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমের অক্লান্ত পরিশ্রমে, ইউরোপীয় চারটি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেয়। প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে বাছাইপর্ব ছাড়াই।

প্রথম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে দল

১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই থেকে ৩০শে জুলাই অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ।একটি শহরের ৩টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় মোট ১৮টি ম্যাচ। অংশগ্রহণকারী ১৩টি দেশকে চার গ্রুপে ভাগ করা হয়। ‘এ’ গ্রুপেই ছিল কেবল চারটি দেশ- আর্জেন্টিনা, চিলি, ফ্রান্স এবং ম্যাক্সিকো। বাকি তিন গ্রুপের প্রতিটিতে ছিল তিনটি করে দেশ। ‘বি’ গ্রুপে যুগোস্লাভিয়া, ব্রাজিল এবং বলিভিয়া। ‘সি’ গ্রুপে উরুগুয়ে, রোমানিয়া, পেরু এবং ‘ডি’ গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে এবং বেলজিয়াম।

চারটি গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা, যুগোশ্লাভিয়া, উরুগুয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র সেমিতে পৌঁছে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় যুক্তরাষ্ট্রকে আর স্বাগতিক দেশ উরুগুয়ে পায় যুগোস্লাভিয়াকে। প্রথম সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনা সহজেই যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে। অপর সেমি-ফাইনালে উরুগুয়েও একই ব্যবধানে ৬-১ গোলে যুগোশ্লাভিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়।

ফাইনালে মুখোমুখি উরুগুয়ে (নীল) ও আর্জেন্টিনা (সাদা) দলের ফরমেশন

মন্টিভিডিওর প্রায় এক লাখ দর্শকের উপস্থিতিতে এক জম্পেস গ্রান্ড ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই ল্যাটিন পরাশক্তি স্বাগতিক উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। প্রায় দশটি জাহাজে করে আর্জেন্টিনা থেকে দর্শক আসে ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করার জন্য। মন্টেভিডিও স্টেডিয়ামের গেইট আট ঘন্টা আগেই সেদিন খুলে দেওয়া হয়। সমাগম ঘটে প্রায় ৯৩ হাজার দর্শকের উপস্থিতি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে বিরতির পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। খেলার দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট বদলে যায়। ৫৭ মিনিটে উরুগুয়ের পেদ্রো গোল করে ২-২ সমতায় আনে। ৬৮ মিনিট ইরিয়াটে গোল করে  স্বাগতিকরা জয়ের স্বপ্ন দেখতে থাকে। আর তাদের সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেন ম্যাচের শেষ মিনিটে উরুগুয়ের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ক্যাস্ট্রো। মন্টিভিডিওর প্রায় এক লাখ দর্শককে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে জয়সূচক গোল করেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যান ক্যাস্ট্রো। ফুটবলে বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি (জুলে রিমে ট্রফি) ঘরে তুলে উরুগুয়ে হয়ে যায় প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দেশ।

ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দিতে মাঠে নামছেন দুই ক্যাপ্টেন, উরুগুয়ের হোসে নাসাজ্জি ও আর্জেন্টিনার ম্যানুয়েল ফেরিরা

প্রথম বিশ্বকাপে কোন তৃতীয়স্থান নির্ধারণী ম্যাচ অনুষ্ঠিত না হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় স্থান দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বকাপে মোট ৭০টি গোল হয়। হ্যাটট্রিক হয় মাত্র তিনটি। বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন যুক্তরাষ্ট্রের পেটানভ। তিনি গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন। সর্বাধিক গোলও করেন আর্জেন্টিনার গুলেইর্মো স্ট্যাবিল। এই আর্জেন্টাইন ৮টি গোল করে ‘টপ স্কোরার’ হন।

একনজরে বিশ্বকাপ ফুটবল ১৯৩০

  • স্বাগতিক দেশ : উরুগুয়ে
  • তারিখ : ১৩-৩০ জুলাই (১৮ দিন)
  • দল : ১৩টি
  • ভেন্যু : এক শহরের তিনটি মাঠে
  • মোট ম্যাচ : ১৮টি
  • গোল : ৭০ (প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩.৮৯)
  • সর্বোচ্চ গোলদাতা : গিলের্মো স্ট্যাবিল (আর্জেন্টিনা, ৮টি)
  • চ্যাম্পিয়ন : উরুগুয়ে
  • রানার্সআপ ও তৃতীয় : আর্জেন্টিনা | যুক্তরাষ্ট্র

১৯৩০ সালের বিশ্বকাপের পর ফিফা ‘অল-স্টার’ এগারো জন খেলোয়াড়দের নাম প্রকাশ করে। যেখানে সাত জনই ছিল উরুগুয়ের। থাকবে না কেন? তখন যে উরুগুয়ে ফুটবলের স্বর্ণযুগের মোহড়া। যার প্রতিফলন দ্বিতীয়বার দেখা যায় ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে। জয় করে নেয় দুইবার বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু দেওয়ার সৌভাগ্য।

প্রথম বিশ্বকাপের ‘অল-স্টার’ ইলেভেন

  • গোলরক্ষক : এনরিক বেলেস্তেরস (উরুগুয়ে)
  • ডিফেন্ডার : হোসে নাসাজ্জি (উরুগুয়ে), মিলুটিন আইভোকোভিচ (যুগোস্লাভিয়া)
  • মিডফিল্ডার : লুইজ মন্টি (আর্জেন্টিনা), আলভারো গেস্টিদো (উরুগুয়ে), হোসে আন্দ্রেদ (উরুগুয়ে)
  • ফরোয়ার্ড : পেদ্রো সিয়া (উরুগুয়ে), হেক্টর ক্যাস্ট্রো (উরুগুয়ে), হেক্টর স্কারোনে (উরুগুয়ে), গুইলার্মো স্ট্যাবিল (আর্জেন্টিনা), বার্ট প্যাটেনাউদে (যুক্তরাষ্ট্র)

(Note: Most of the photos are collected from Fifa’s official website & other news sources)

error: Content is protected !!