fbpx

আনিসুল হকের ‘মা’

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন মা। একজন আদর্শবান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মা -কে ঘিরে রচিত এই উপন্যাসটি। লড়াই করে বে‍ঁচে থাকা ! শত আঘাতেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা হার না মানা এক আদর্শবান মায়ের বাস্তব জীবনী নিয়ে লেখা এই বই।

হ্যাঁ, বলছিলাম ‘শহীদ আজাদ’ এর সেই রত্নাগর্ভা মা সাফিয়া বেগমের কথা ! চলুন আনিসুল হকের বই থেকে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক…

বইঃ মা
লেখকঃ আনিসুল হক
ধরণঃ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস
প্রকাশনীঃ সময় প্রকাশন
প্রচ্ছদঃ ধ্রুব এষ

শুরু করার আগে আনিসুল হককে নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়…

লেখক আনিসুল হক

আনিসুল হক একাধারে বাংলাদেশী কবি, লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্ভর করে সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত উপন্যাসটি বাংলাদেশের কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের একটি সর্বাধিক পাঠক নন্দিত উপন্যাস। লেখক এই কাহিনীর সন্ধান পান মুক্তিযোদ্ধা নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর কাছ থেকে। জনপ্রিয় এই উপন্যাসটি বাংলা ভাষার পাশাপাশি দিল্লী থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং ভুবনেশ্বর থেকে উড়ে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে ।

উপন্যাস রিভিউ : মা

আজাদের মা, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। বিয়েও হয় এক বিখ্যাত ধনীর সাথে। আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরী। তিনি টাটা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। কানপুর থাকা কালীন আজাদের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় আজাদরা এ দেশে চলে আসে। দেশে এসে স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে বিশাল ব্যবসা শুরু করেন। তারা ইস্কাটনে থাকত। তাদের সেই বাড়িটিও ছিলো অত্যন্ত বিলাসবহুল দেখার মতো সুন্দর।

সে সময় আজাদের বাবা ইউনুস চৌধুরী ছিলেন দেশের প্রথম সারির ধনীদের একজন। আজাদরা ছিল ঢাকার সবচেয়ে ধনী পরিবার। তিনি ছিলেন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি। আজাদ ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান। অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন ছিল তার।

ইস্পাত কঠিন, আত্মমর্যাদাবান সাফিয়া বেগম। তাই তার স্বামী যখন দ্বিতীয় বিবাহ করলেন, তখন তিনি তা মেনে নেননি। ছোট্ট আজাদকে নিয়ে শত বিলাসিতা আর প্রাচুর্যের প্রাচীর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। অভাব অনটনকে পেছনে ফেলে নিজ হাতে তিনি মানুষের মত মানুষ করে তুলেছিলেন আজাদকে। ছেলেকে কখনো বাধা দেননি দেশের জন্য লড়তে। তবুও বেঁচে থাকার অবলম্বন একমমাত্র ছেলে হারানোর ভয় পিছু ছাড়েনি।

অবশেষে আজাদ ও অংশ নেন যুদ্ধে। আজাদের মা তার ঘরটাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি বানিয়ে দেন। তিনি নিজেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন যথাসাধ্য।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে আজাদ তাঁর বন্ধুদের সাথে যোগ দেয়। ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুন এর দলে তিনি ছিলেন। সেই সময় ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুন ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ত্রাসের কারণ। এই ক্র্যাক প্লাটুন তৎকালীন সময়ে “হিট এন্ড রান” পদ্ধতিতে অসংখ্য আক্রমণ পরিচালনা করে পাকিস্তানী সেনাবহিনীর উপর। অতঃপর ১৯৭১ সালের ৩০ আগষ্ট এই দেশেরই কিছু গুপ্তচরের সহায়তায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ আর বন্ধুদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে মিলিটারিদের হাতে ধরা পড়ে। সে রাতে আজাদ সহ রুমী, কাজল, বদি, বাকের সহ সবাই ধরা পড়ে মিলিটারিদের হাতে।

মিলিটারির নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ছেলে যখন কি করবে জানতে চাইলো, মা উত্তর দেন, বাবা একটু শক্ত হয়ে থেকো সহ্য করো। তবু যেনো কারো নাম বলোনা।

জাহানারা ইমাম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কি পরিমাণ শক্তি ধারণ করেছিলেন এই মানুষটা তার বুকের ভেতর !

জেলে ছেলের সাথে মা দেখা করতে গেলে ছেলে মাকে বলে, ‘মা ভাত খেতে ইচ্ছা করে খুব। কাল ভাত নিয়ে এসো। এরা অল্প ভাত দেয়। ভাগে পাই না।’ মা বলেন, আচ্ছা কাল নিয়ে আসবো।

মা যখন ফিরে যাচ্ছেন তার কানে কেবলই বাজছে ছেলের কথা মা ! খুব ভাত খেতে ইচ্ছা করে। বাড়িতে ফিরে মাও সে রাতে আর ভাত খাননি। ছেলেকে না খাইয়ে রেখে কি করে মা খেতে পারেন? শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কখন সকাল হবে? আর মা ছেলের জন্য ভাত নিয়ে যাবেন। দুই ক্যারিয়ার ভর্তি করে সোজা চলে গেন রমনা থানায় সন্ধ্যায়। কিছুক্ষণ পর এলো মিলিটারির গাড়ি। মা এগিয়ে গেলেন। একজন একজন করে বন্দীদের দেখছেন। নাহ, কই আজাদ তো নেই। পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন আর কোন গাড়ি আসবে কিনা। পুলিশ জবাব দেয়, ‘না একটাই তো শেষ গাড়ি। আর তো আসবে না।’

আজাদ তো আসেনি। এরকম আরো যারা ছাড়া পেয়েছে তাদের নিয়ে তো আরও গাড়ি আসতেও পারো। এমন ভাবনা চিন্তার মধ্যেই শুনতে পায় ফজরের আজান। সাথে সাথেই ছুটে যান তেজগাঁও থানায়। সেখানে ছেলেকে না পেয়ে যান এমপি হোস্টেল। নাহ সেখানেও নেই।

মা বিশ্বাস করতেন আজাদ ফিরে আসবে। মা তাকে বিয়ে দেবেন। পাত্রীও দেখে রেখেছেন। ছেলের বউ এর জন্য আলাদা করে রেখেছেন গয়না যেটাতে কোনদিনও হাত দেননি শত অভাব সত্তেও। মৃত্যুর আগে শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন তবুও চিকিৎসা করাননি। মৃত্যুর আগে সহায় সম্পদ গয়নাগাটি যা ছিল বোনের ছেলেমেয়েদের দিয়ে যান। ভাগ্নে জায়েদের হাতে একটা ট্রাংকের চাবি তুলে দেন। ট্রাংক খুলে জায়েদ দেখে প্রায় একশ ভরি গয়না। আর জায়েদকে বলেন মৃত্যুর পরে কবরে তার পরিচয় হিসেবে শুধু লেখা থাকবে ‘শহীদ আজাদের মা’।

আজও কেউ যদি যায় জুরাইন কবরস্থানে। দেখতে পাবেন এপিটাফে লেখা আছে মোছাম্মৎ সাফিয়া বেগম “শহীদ আজাদের মা”!

প্রশংসা

আজাদের মৃত্যুর ১৪ বছর পর, ঠিক ৩০ আগষ্ট আজদের মা পৃথিবী ছেড়ে যান। এই ১৪টা বছর তিনি এক দানা ভাতও মুখে দেননি ! এই ১৪টা বছর তিনি বিছানায় শোননি। শক্ত মেঝেতে, শক্ত পিড়িতে মাথা রেখে ঘুমিয়েছেন। কারণ তার আজাদও যে ভাত খেতে পায়নি। একটা বালিশ পায়নি মাথা রাখার জন্য। তাদের মা-ছেলের এমন ভালবাসায় আমি “মা” -তে মুগ্ধ !!

আমি একই সময়ে ম্যাক্সিম গোর্কি আর আনিসুল হকের “মা”!, এই দুই “মা” পড়েছি। প্রায় সবাই জ‍ানতে চায়, কোন “মা” সেরা?

আমি আজাদের “মা” আর পাভেলের “মা” দুই মাকে একই রুপে খোঁজে পেয়েছি! রুশ মা আর বাংলার মা ! এই দুই মায়ের মাঝে আমি একটাই রুপ দেখতে পেয়েছি- তা হলো মমতাময়ী রুপ! আর গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, সব মায়েদের একটাই রুপ !

আমি বলবো না! এই বইটা পড়তেই হবে! না পড়লে মানব জনম বৃথা। বই পড়ে তো আর মা’কে দেশকে ভালবাসা যায় না। মন থেকে ভালবাসতে হয়। মা কে জানতে,দেশকে জানতে পড়তে পারেন এই বইটি। এইটুকু বলতে পারি, বৃথা যাবে না আপনার সময়টুকু…

হ্যাপি রিডিং !

Leave a Reply

error: কপিরাইট প্রটেক্টেড !