fbpx

সুন্নতে খৎনা বা মুসলমানির ইতিহাস

বাসায় প্রচুর মেহমান এসেছে। তারা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। গত রাত থেকেই বাসায় মেহমানদারির আয়োজন চলছে। বাড়ি সাজিয়ে খাবারদাবারের বিশাল ব্যবস্থা। চারিদিকে উৎসব উৎসব একটা পরিবেশ চলে এসেছে। মেহমানদের হাতে নানান রকম উপহার। এত সব আয়োজন খুব ছোট্ট একটা বাচ্চাকে ঘিরে। সেও সবার সাথে এ আনন্দে শরিক হয়েছে। খুশিতে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে জানেনা, আজকে তার কপালে কি আছে…

সকালবেলা চলে এলো এক ভদ্রলোক। যাকে বলা হয় ‘হাজাম’। সে খৎনা করায়। হাজামের আগমণের মিনিটখানেক পর বাড়ির মুরব্বিরা চোখের পলকেই চলে এলো ব্লেড, সাদা কাপড়, তুলা, বাঁশের কঞ্চি সহ এক বাটি মিষ্টি নিয়ে। দুরন্ত ছেলেটা এবার কিছুটা চুপসে গেলো। হাজাম পেশাদারিত্বের সহিত বাচ্চাটার সঙ্গে গল্প করতে লাগলেন। এরপর ভুলিয়ে ভালিয়ে তিনি লক্ষ্যভেদ করলেন। ‍বাচ্চাটা মা-হারা গরুর বাছুরের মত রুদ্রস্বরে চেঁচাচ্ছে। এরমাঝেই চলে এলো হাজামের গ্রিন সিগন্যাল। বাচ্চাটার মুখে দেয়া হলো মিষ্টি। বাচ্চা সে মিষ্টি মুখ থেকে থু মেরে ছুঁড়ে ফেলে চেঁচানো অব্যাহত রাখলো। মিশরের মমির মত সুন্দর করে তুলা ও সাদা কাপড়ের টুকরো দিয়ে বেঁধে দেয়া হলো ক্ষতস্থান। পরিয়ে দেয়া হলো নতুন লুঙ্গি ! বাইরে থেকে হাততালির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মেহমানদের মধ্যে অল্পবয়স্ক যারা আছে, তারা হাততালি দিচ্ছে। আর বয়স্কদের মধ্যে কেউ বলছে আলহামদুলিল্লাহ, কেউ ভুল করে বলছে মাশাল্লাহ, আবার কেউব‍া বলছে ইনশাল্লাহ !

সাধারণ গ্রাম বাংলার সুন্নতে খতনা কিংবা মুসলমানি’র দৃশ্য এটি। তবে শহরে এখন আর এসব দেখা যায় না। গ্রাম থেকেও দিনকে দিন উঠে যাচ্ছে হাজামের কাঁচিঘর। এখন ডাক্তার দিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই করানো হয় মুসলিম সন্তানদের সুন্নতে খৎনা ! উপরে যে ঘটনাটির কথা বললাম, তা আমারই জীবন থেকে নেয়া। কিছুদিন আগে যখন এই ছারপোকা ম্যাগাজিনের আরেকটি সংস্থা ছারপোকা ব্লাড ব্যাংকের রক্তদান ক্যাম্পেইন হয়, তখন এর আয়োজক এবং পরিচালক ‍কাজী নিপু ভাই আমাকে বলেন রক্তদান করতে। শারীরিক কিছু অসুস্থতার ‍কারণে আমি রক্তদান করতে পারিনা। বিষয়টা আমি খুব লজ্জ‍ার সহিত তাকে বললাম। এবং রক্তদান করতে না পারার দুঃখটা তার সাথে শেয়ার করলাম। তখন নিপু ভাই আমাকে বললেন, “তোমার মুসলমানি হয়েছে না? তাহলে মন খারাপ করো কেনো? ওটাই তো তোমার জীবনের প্রথম রক্তদান” !

তিনি ‍মূলত আমাকে সান্তনা দেয়ার জন্য মজার ছলেই কথাটি বলেছেন। তবে সেখান থেকেই এ বিষয়টি নিয়ে লেখার কথা আমার মাথায় আসে। তাই শিরোনামটাও সেখান থেকেই তুলে নিলাম। এবার মূল কথায় যাওয়া যাক…

সুন্নতে খৎনা কি এবং এই বিশেষ রীতির উৎপত্তি কিভাবে হলো, তা অনেকেই জানেন না। কিন্তু ঠিকই তার মুসলমানি হয়েছে। আমাদের চারপাশেই এরকম অসংখ্য লোক পাওয়া যাবে। অন্তত একজন মুসলিম হিসেবেও আমাদের এই সুন্নতে খৎনার ইতিহাস জানা উচিত। আসুন জেনে ফেলি…

সুন্নতে খৎনা কি?

সুন্নতে খতনা সম্পর্কে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। পুরুষাঙ্গের অগ্রভাবে বা সামনের দিকে যে অতিরিক্ত চামড়া পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশটাকে ঢেকে রাখে, সেই অতিরিক্ত চামড়া কেটে ফেলে দেওয়াই খতনা বা মুসলমানি। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী শিশু অবস্থায় সকল মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদীদের বাচ্চাদের খতনা করানো হয়।

সুন্নতে খৎনায় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

মুসলমানি করানো বা মুসলিম সন্তানদের খতনা করানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। কোনো মুসলিম পরিবারের সন্তানকে খৎনা করালে এটাকে বলা হয় সুন্নতে খৎনা (Khitan)। এটি শিআরে ইসলাম অর্থাৎ ইসলামের মৌলিক নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“ফিতরাত (তথা নবীগণের সুন্নত) পাঁচটি – খতনা করা, নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করা, বগলের পশম উঠানো, মোঁচ বা গোঁফ ছোট করা এবং নখ কাটা।” [সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬২৯৭]

সুতরাং মুসলিমদের খতনা করাতেই হবে। যদি কেউ প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে তবুও তাকে খতনা করাতে হবে। তবে ছোট বয়সে খতনা করানো উত্তম সময়।

কেনো করাবেন মুসলমানি বা এই সুন্নতে খৎনা ?

কিছু কিছু রোগ হলে যেমন ফাইমোসিস, প্যারাফাইমোসিস হলে খতনা বা মুসলমানি করাতে হয়। ফাইমোসিস হলো পুরুষাঙ্গের মাথার দিকের চামড়া এমনভাবে মূত্রনালীকে ঢেকে রাখে, যার কারণে প্রস্রাব ঠিকমতো বের করতে পারে না। প্রস্রাব বের হতে না পেরে পুরুষাঙ্গের মাথা ফুলে ওঠে এবং শিশু ব্যথায় কান্নাকাটি করতে থাকে। এভাবে বেশিদিন চলতে থাকলে প্রস্রাবে ইনফেকশন, এমনকি কিডনি ফেইলিওরও হতে পারে। আবার অনেক সময় পুরুষাঙ্গের মাথার দিকের চামড়া উল্টে গিয়ে টাইট হয়ে যায়। যার ফলে চামড়াকে আর সামনে ও পেছনের দিকে নাড়াচাড়া করা যায় না। এক্ষেত্রে মাথার দিকে ফুলে যায় এবং রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। উভয় ক্ষেত্রেই জরুরি ভিত্তিতে খতনা করানো প্রয়োজন। অনেক সময় ছোট শিশুদের পুরুষাঙ্গ প্যান্টের চেইনের সঙ্গে আটকে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতেও অনেক সময় খতনা করানো হয়।

সুন্নতে খৎনা’র উপকারিতা

জেনে হয়ত অবাক লাগবে, খ‍তনার কিন্তু উপকারিতাও আছে! সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতাটি হলো, খতনা করে পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র খতনার কারণেই এ ক্যান্সার মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্য নেই বললেই চলে। পুরুষাঙ্গের মাথার বাড়তি চামড়ার নিচে এক ধরনের সাদা পদার্থ জমে এবং এটিই পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের জন্য দায়ী।

বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পুরুষ হল খতনাকৃত অর্থাৎ তাদের খতনাকর্ম সম্পাদিত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে এবং ইসরাইলে (যেখানে এটি প্রায়-সার্বজনীন একটি ধর্মীয় বাধ্যতামূলক কর্ম), যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অংশে এটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। খতনার মূল উৎপত্তি কখন ও কোথায় ঘটেছিলো তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও সবচেয়ে প্রাচীন তথ্যভিত্তিক প্রমাণ অনুযায়ী প্রাচীন মিশরেই এর উৎপত্তি ঘটে। এর উৎপত্তি সম্পর্কে বহু তত্ত্বের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার অন্যতম হলো এটি একটি ধর্মীয় উৎসর্গবিশেষ এবং একটি বালকের বয়ঃপ্রাপ্তিতে প্রবেশকে কেন্দ্র করে বয়স বৃদ্ধির সাংস্কৃতিক প্রথা। ইহুদি ধর্মে এটি ধর্মীয় প্রথার একটি অংশ এবং ইসলাম ধর্ম, কপ্টিক খ্রিষ্টধর্ম ও ইথিওপীয় অর্থোডক্স গির্জায় এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় আচার।

পরিশেষে,

মুসলমানি নিয়ে সবারই নিশ্চয়ই কিছু না কিছু স্মৃতি রয়েছে। আসলে এই মুসলমানি শব্দটাকে ঘিরেই একধরণের আবেগ কাজ করে আমাদের মাঝে। “একে একে সব বন্ধুর মুসল‍‍মানি হয়ে যাচ্ছে। সামনে আমারো হবে”- স্কুলজীবনে এরকম একটা ভয় আমাদের সবার মধ্যেই কাজ করত। সেসব দিনগুলোকে স্মরণ করে সুন্নতে খৎনার ইতিহাস নিয়ে লেখাটি সম্পূর্ণ করছি। নিজে মুসলমানি করুন, অন্যদেরকেও মুসলমানি কর‍াতে উৎসাহ দিন…

error: Content is protected !!