fbpx

অস্বাভাবিক ও বিচিত্র কিছু ভয় ‍বা ‘ফোবিয়া’

চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের জীবন। ছোটখাট কিছু না কিছু ভয় আমাদের জীবনে সবারই আছে। কিন্তু কিছু মানুষ সেই ছোট কিন্তু অদ্ভুত ভয়টাকে এমনভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে ফেলেন যে, স্বাভাবিক জীবনযাপন তো দূরের কথা, পুরো জীবনটাকেই তারা এলোমেলো বানিয়ে ফেলেন। এমনই কিছু অস্বাভাবিক ও বিচিত্র ভয় বা ফোবিয়া নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন। মিলিয়ে দেখুন আপনার মাঝে এর কোনটার ছাপ রয়েছে কিনা…

ফোবোফোবিয়া

সাধারণত মানুষ ভয় পেলে সেটাকে ফোবিয়া বলে। কিন্তু কোন কোন মানুষ অতিরিক্ত পরিমাণে ভয় পেলে এবং প্রতিনিয়ত সেটা চলতে থাকলে ভয় পাওয়াটা আর নির্দিষ্ট কিছুর ভেতরে আবদ্ধ থাকে না। সেটাকে তখন বলে ফোবোফোবিয়া বা ভয় থেকেই ভয় পাওয়া। যেখানে কোন কারণ ছাড়াই একজন মানুষ ভয় পান।

পেডিওফোবিয়া

ছোট্ট বাচ্চাদের অত্যন্ত পছন্দের একটি বস্তু হচ্ছে পুতুল। শুধু বাচ্চারাই নয়, একজোড়া সুন্দর চোখ ও মায়াবী চেহারার পুতুলকে কমবেশি সব বয়সের মানুষই পছন্দ করে থাকেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো পেডিওফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুতুলকে ভয় পেয়ে থাকেন। তাদের ধারণা পুতুলটি যেকোনো সময় জীবিত হয়ে উঠবে এবং তার ক্ষতি করে বসবে।

ফিলোফোবিয়া

অকারণে প্রেমে ভয় পাওয়ার রোগকে বলা হয় ফিলোফোবিয়া। যারা প্রেমের সম্পর্কে যেতে ভয় পাচ্ছেন, তারা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক চোখে দেখলেও বিষয়টা কিন্তু স্বাভাবিক নয়। বরং এটি একটি মানসিক রোগ। যা দিন দিন আপনার জীবনদর্শনকে আরো জটিল করে তুলবে।

ম্যাগেইরোকোফোইয়া

খাওয়া আর রান্না করা মানব ইতিহাসের একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও কিছু মানুষ আছেন যারা রান্নার নামে ভয় পান। আর এই ফোবিয়ার নাম ম্যাগেইরোকোফোবিয়া। শুধু রাঁধতেই নয়, রান্নাসংক্রান্ত কথাবার্তা ও রান্না জানে এমন লোকের সাথেও বেশ অস্বস্তিবোধ করেন এই রোগীরা।

এইসোপট্রোফোবিয়া

আয়নাতে মুখ দেখতে পছন্দ করেন সবাইই। তবে এদের চাইতে একদম আলাদা হচ্ছে এইসোপট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষেরা। এরা আয়নার সামনে যেতেই ভয় পান। বিশেষ করে যখন একলা থাকেন। অশুভ কিছুর আশঙ্কা থেকেই এই ভয় পান তারা।

হেক্সাকোসিওইহেক্সেকোনটাহেক্সাফোবিয়া

এত খটমটে আর বিশাল নামের ফোবিয়াটি আর কিছুই নয়। ছোট্ট সংখ্যা ৬৬৬ কে ভয় পাওয়া। অবাক করার মতন হলেও সত্যি ব্যাপার যে ৬৬৬ নাম্বারটিকে অনেকে ভয় পান। কারন মনে করা হয় এটি বাইবেল অনুসারে শয়তানের নাম্বার। অনেকে আবার এটার পাশাপাশি ১৩ তারিখ শুক্রবারকেও ভয় পান। ওই ফোবিয়ার নাম হচ্ছে আরাসকাভেডেকাত্রিয়াফোবিয়া।

প্যানথেরাফোবিয়া

সব যুগের খুবই সাধারণ একটি সমস্যা হচ্ছে বউ-শ্বাশুড়ির সমস্যা। আর এসব শুনে হোক,  বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে হোক বা ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখেই হোক, সত্যিকার অর্থেই অনেকেই ভুগে থাকেন এই ফোবিয়ায়। যার ভুক্তভোগীরা শ্বাশুড়িদেরকে ভয় করেন মারাত্মকভাবে।

ল্যাট্রোফোবিয়া

আমাদের জীবনের সুরক্ষার জন্য আমরা চিকিৎসকদের উপর নির্ভর করি। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পান, তারাই ল্যাট্রোফোবিয়াইয় আক্রান্ত।

নসোকমফোবিয়া

অনেকে হাসপাতালে যেতে ভয় পান। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, জীবাণুনাশক এর গন্ধ এবং অসুস্থ মানুষদের দেখলে তাদের ভয় হয়। এটি এক ধরনের অযৌক্তিক ভয়। তারা মনে করেন যে হাসপাতালে গেলেই তারা অসুস্থ হবেন এবং তাদের মৃত্যু ঘটবে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচারড নিক্সন নসোকমফোবিয়ায় ভুগতেন।

নসোফোবিয়া

প্লাস্টিক কিভাবে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং সেলফোন ব্যবহার করলে মাথার ভেতরে টিউমার হতে পারে এগুলো শুনে শুনে ক্লান্ত আপনি? প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা হয় এটা মনে করে যারা ভয় পান তারাই নসোফোবিয়ায় আক্রান্ত।

মিসোফোবিয়া

যদি দরজার ছিটকিনি খুলতে, চায়ের কাপ, চশমা, রিমোট ইত্যাদি দৈনন্দিন জিনিসগুলো ধরতে গেলেই আপনার মনে হয় যে এগুলোকে জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার যদি হয় আপনার প্রিয় বন্ধু তাহলে আপনি মিসোফোবিয়ায় আক্রান্ত।

হিমাটোফোবিয়া

হিমাটোফোবিয়ায় আক্রান্ত যারা তারা নিজের বা অন্যের রক্ত দেখলে অজ্ঞান হয়ে যায়। রক্ত দেখলে তাদের মৃত্যুর কথা মনে হয় বলে তারা ভয় পেয়ে যান। এমনকি তারা মুরগীর রক্ত দেখলেও ভয় পায়।

ট্রাইপ্যানোফোবিয়া

অনেক সাহসী মানুষও ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ দেখলে ভয় পেয়ে যান। ট্রাইপ্যানোফোবিয়ায় আক্রান্তরা সিরিঞ্জ দেখলেই মাথা ঘোরানো, শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পাওয়ার মত সমস্যায় ভুগে থাকেন।

টমোফোবিয়া

টমোফোবিয়ায় আক্রান্তরা অপারেশন করাতে হবে শুনলে ভয় পান। তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য অপারেশন করাটা জরুরী হলেও তা করানো যায় না। তাদের অবস্থা এমন হয় যে, কোনভাবে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেতে পারলেও দেখা গেছে যে, চেতনানাশক দেয়ার আগেই তারা অজ্ঞান হয়ে গেছেন!

থানাটোফোবিয়া

এমন কোন মানুষ নেই যে মৃত্যুকে ভয় পায়না। মৃত্যুকে ভয় পাওয়া অযৌক্তিক কিছু নয়। কিন্তু যখন এই ভয় আপনার দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে, জীবনকে উপভোগ করাকে সীমিত করে দেবে এবং এই ভয়ে আপনি যখন মানুষের সাথে যোগাযোগ করাও বন্ধ করে দেবেন তখন এই ভয়কেই থানাটোফোবিয়া বলে।

সমনিফোবিয়া

আমরা সবাই রাতে কমবেশি খারাপ স্বপ্ন দেখে থাকি। আর এই খারাপ স্বপ্ন দেখাই অনেকের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, স্বপ্ন দেখার ভয়ে তারা ঘুমাতে চান না এবং ঘুমকে ভয় পেতে শুরু করেন। এই ফোবিয়াটির নাম হলো সমনিফোবিয়া। সমনিফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমকে প্রচণ্ড ভয় পান এবং দীর্ঘদিন না ঘুমানোর কারণে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হেফিফোবিয়া

প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্য ও ঘনিষ্ঠতা কার না ভালো লাগে! প্রিয় মানুষদের সাথে কাটানো ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো আমাদের একটি ভালো সময় উপহার দেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য মানুষদের ঘনিষ্ঠতাও কিছু কিছু মানুষের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অদ্ভুত ধরনের এই ফোবিয়াটির নাম হলো হেফিফোবিয়া। হেফিফোবিয়ার কারণে অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কে জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া বৈবাহিক সম্পর্কেও ফাটল ধরার মতো ঘটনা ঘটে থাকে এই ফোবিয়ার কারণে।

ম্যাগেইরোকোফোবিয়া

ম্যাগেইরোকোফোবিয়া শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মাগেইরোকোস থেকে, যার অর্থ হলো রান্নায় দক্ষ একজন ব্যক্তি। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা রান্না করতে ভয় পান। শুধু তাই নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরা ভালো রাঁধুনিদেরকেও ভয় পেয়ে থাকেন। রান্না সংক্রান্ত সকল কিছুই এরা এড়িয়ে চলেন।

হেলিওফোবিয়া

স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সূর্যের আলোতে বাইরে বের হতে পছন্দ করেন। কিন্তু হেলিওফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সূর্যের আলোর ভয়ে বাইরেই বের হতে চান না। আর এর ফলস্বরূপ তাদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর অভাবজনিত রোগ দেখা যায়।

টোকোফোবিয়া

মা হওয়া প্রতিটি বিবাহিত নারীর জীবনেই অনেক বড় একটি স্বপ্ন এবং মা হওয়ার অনুভূতি প্রতিটি নারীর জন্যই শ্রেষ্ঠ একটি পাওয়া। কিন্তু এমন অনেকেই আছেন যারা গর্ভধারণে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে থাকেন। আর এই ফোবিয়াটির নাম হলো টোকোফোবিয়া। টোকোফোবিয়ায় আক্রান্ত নারীদের মধ্যে অনেকে সন্তান জন্মদানে, অনেকে আবার ‘ডেলিভারি’ শব্দটিতেই ভয় পেয়ে থাকেন।

ডেইপনোফোবিয়া

পরিবারের সবার সাথে ডিনার করার সময় স্বাভাবিকভাবেই সারাদিনের ঘটা বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আমরা কথা বলে থাকি। কিন্তু ডেইপনোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ডিনারের সময় কথা বলতে ভয় পান। তাই তারা খাবারের সময় চুপচাপ থাকেন অথবা একা একাই খাবার খেয়ে থাকেন।

স্পেকট্রোফোবিয়া

আয়নার নিজেদের চেহারা দেখতে কে না ভালোবাসে! কিন্তু এখন যদি বলা হয় যে, কেউ কেউ আয়নাকেও ভয় পেয়ে থাকেন তাহলে তা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য হবে না। তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা আয়নাকে ভয় পেয়ে থাকেন। তাদের ধারণা আয়নার পেছনে অবস্থান করছে একটি ভৌতিক পৃথিবী, যা আয়নার দিকে তাকালেই তাকে নিজের দিকে টেনে নেবে। আয়নার প্রতি এই ভয়কে বলা হয়ে থাকে স্পেকট্রোফোবিয়া। স্পেকট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্বকেও ভয় পেয়ে থাকেন। যদিও বা তারা জানেন যে, তাদের এই ভয় একদম অযৌক্তিক, তবুও তারা সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত থাকেন। অনেক সময় তারা আয়নায় নিজেদের পেছনে মানুষের ছায়া বা মূর্তিও দেখে থাকেন।

প্যানথেরাফোবিয়া

সকল বিবাহিত নারী বা পুরুষকে যে ভয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তার নাম হলো প্যানথেরাফোবিয়া। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের শ্বাশুড়িকে ভয় পেয়ে থাকেন। পশ্চিমা বিশ্বে এই ফোবিয়া বেশি দেখতে পাওয়া যায়।

অ্যারাচিবুটিরোফোবিয়া

ভয় যে কত অদ্ভুত রকমের হতে পারে তার প্রমাণ মেলে অ্যারাচিবুটিরোফোবিয়ার দিকে তাকালে। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা মুখের ভেতরে ওপরের মাড়িতে পিনাট বাটার লেগে যাওয়ার ভয়ে সর্বদা ভীত থাকেন।

ক্যাথিসোফোবিয়া

বসার ভয়কে বলা হয় ক্যাথিসোফোবিয়া। স্কুলে শাস্তিস্বরূপ ধারালো কিছুর ওপরে বসতে দেওয়া থেকেই এই ভয়ের উত্পত্তি হয়। অনেকে ছোটবেলায় শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হওয়ার কারণেও ক্যাথিসোফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। এছাড়া সামনে অপছন্দের ব্যক্তির বসে থাকার কারণেও ক্যাথিসোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বসতে ভয় পান।

ফোবিয়া (Phobia) হচ্ছে অস্বাভাবিক ভীতি।  একে সহজভাষায় বর্ণনা করা যায় স্থায়ী ভয় হিসেবে। এসব ক্ষেত্রে ভিকটিম অনেকক্ষণ ধরে কোনো বিষয় বাস্তবে রূপ নেবে ধারণা করে ওই নির্দিষ্ট বিষয় থেকে দূরে থাকে এবং একইসাথে মানসিক চাপে ভুগে। কোনো কোনো সময় এটা ভিকটিমকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যায়। যদি আপনার এধরনের কোনো ফোবিয়া থাকে, তাহলে তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে মনোবিদের পরামর্শ নিন…