ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এল ক্লাসিকো

এল ক্লাসিকো
রিয়াল ১১-১ বার্সা, ১৯৪৩ সালের কোপা ডেল জেনেরালিসিমোর দ্বিতীয় লেগের এল ক্লাসিকোর স্কোরলাইন। এটা কোনো সাধারণ ম্যাচ ছিল না। এটা ছিল কাপের সেমিফাইনাল। আর প্রথম লেগে বার্সা এগিয়ে ছিল ৩-০ গোলে। তাহলে কি হয়েছিল দ্বিতীয় লেগে যার ফলে এই অবিশ্বাস্য স্কোর লাইন?

খেলাধুলার সাথে রাজনীতির সম্পর্ক অনেক পুরনো। হিটলার-মুসোলিনি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটা স্বৈরশাসকই খেলাধুলায় প্রভাব ফেলেছে। ১৯৪৩ সালের সেই ঘৃণিত এল ক্লাসিকোর পেছনেও ছিল এক অহংকারী শাসকের প্রভাব এবং একদল হিংস্র সমর্থকের ক্ষিপ্ত আচরণ।

১৯৩৯ সালের গৃহযুদ্ধের পর ক্ষমতায় আসেন সৈরাচারী ফ্রাংকো। ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা দেন “আমার শাসন নির্মিত হবে বেয়নেট ও রক্তের উপর, কোন নির্বাচনের উপর নয়!”

মাদ্রিদকে ক্ষমতার কেন্দ্র বানিয়ে কাতালুনিয়ার উপর শুরু করলেন অত্যাচার। তার রোষানল থেকে মুক্তি পেতে কাতালুনিয়া আর বাস্ক স্বাধীনতাআন্দোলন শুরু করল। কিন্তু জেনারেল ফ্রাংকো তাদের কোনো আন্দোলনই গড়ে উঠতে দেননি। উলটা ছিনিয়ে নিলেন তাদের মাতৃভাষা। অসহায় কাতালান আর বাস্কের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে গেল ফুটবল।কাতালানের প্রতিনিধি এফসি বার্সেলোনা, বাস্কের প্রতিনিধি এথলেটিক বিলবাও।

নিজের ঘরের মাঠে ৩-০ গোলের জয় নিয়ে মাদ্রিদে পৌছায় বার্সেলোনা দল। তখনো তাদের কোনো ধারণা ছিল না তাদের সাথে কি ঘটতে যাচ্ছে। মাদ্রিদে পৌছাতেই তাদের সাথে রোমান গ্লাডিয়েটর যুগে কেনা গোলামদের সাথে যেরূপ আচরণ করা হয় ঠিক তেমন আচরণ করা হয়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ওমন হারের ক্ষিপ্ত হয়েছিল মাদ্রিদবাসী। কিন্তু তাদের ক্ষোভ যে এতটা ভয়ানক রূপে প্রকাশ পাবে সে ধারণা ছিল না কারো। ম্যাচের পূর্বেই মাদ্রিদের স্টেট ডিরেক্টর বার্সার ড্রেসিংরুমে তাদের হুমকি দিয়ে আসেন এবং বলেন “ফ্রাংকোর দয়ায় তোমরা বেঁচে আছ এটা মাথায় রেখো”!

ব্যস, এতেই ভেঙ্গে পড়ে বার্সার প্রতিটা খেলোয়াড়। বার্সার খেলোয়াড়রা মাঠে প্রবেশ করার সাথে সাথেই গ্যালারি ভর্তি দর্শক এক সাথে কোরাস শুরু করে কাতালানদের রক্তবন্যা চেয়ে। গগনবিদারী শব্দে প্রত্যেকটা প্লেয়ারের মাথা কেটে ফেলার আবেদন জানাতে থাকে তারা। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে বার্সার খেলোয়াড়রা। নিজের ও পরিবারের জীবন নিয়ে শঙ্কায় পড়ে যায় খেলোয়াড়রা। শুরু হয় খেলা। মনের মধ্যে একরাশ ভয় নিয়ে বার্সার খেলোয়াড়রা ঠিকমত স্থির হতে পারছিল না। শংকা ছিল এই বুঝি গ্যালারির হাজার হাজার দর্শক মাঠে প্রবেশ করে তাদের উপর আক্রমন করবে।

বিশ হাজার দর্শকের গগনবিদারী কোরাস “Knock their head off “

গোলরক্ষক লুইস মিরো তো পেনাল্টি বক্সেই দাঁড়াতে পারেননি তার দিকে মাদ্রিদিস্তাদের বিভিন্ন জিনিস ছুড়ার কারনে। হাফ টাইমেই বার্সাকে হজম করতে হয় ৮ গোল। প্রাণের ভয়ে দ্বিতীয় হাফে মাঠে নামতে চান নি বার্সার অধিকাংশ খেলোয়াড়। তবুও তাদের মাঠে নামতে হয় এবং ১১-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারতে হয়। ফলশ্রুতিতে তৎকালীন বার্সা প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেন। মাদ্রিদ পরবর্তীতে ফাইনালে বাস্ক প্রতিনিধি এথলেটিক বিলবাও এর কাছে হেরে যায়।

বিলবাও লিজেন্ড তেলমো জারা একাই হারিয়ে দেন মাদ্রিদকে। সেই হারটা রিয়ালের হলেও জয়টা ছিল বিলবাও ও কাতালানদের যৌথভাবে।

Comments

comments