মেয়েদের যত কথা…

মেয়ে

স্বয়ং ঈশ্বর বলে মেয়েদের বুঝতে পারেন না, সেখানে মানুষ কোন ছাড়!

কথাটি অত্যন্ত সত্য, কারণ এখানে ‘মানুষ এবং মেয়ে’ আলাদা আলাদা করে বুঝানো হয়েছে, আর সম্ভবত ঈশ্বর নিজেও পুরুষ এমনটাই ধারনা সবার ! ধরেই নিচ্ছি মানুষ হিসেবে পুরুষ শ্রেণীকেই বুঝানো হয়েছে। আর মেয়ে বলতে তো মেয়েই। তাই মানুষগণ মেয়েদেরকে বুঝতে পারেন না, সাথে ঈশ্বর নিজেও…

মেয়েদের মনের অনেক কথা আছে, যা বলতে গেলে প্রতিটি মেয়েই তাদের নিজেদের সাথে আরো চারটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেরায় – তাদের কেউ মা, বোন, বান্ধবী, ভবিষ্যৎ সন্তান (যদিও তাদের জন্ম না হলেও মেয়েদের মাথার মধ্যে একটি কাল্পনিক পরিবার থাকে এবং সেখানে উক্ত সন্তানের অবস্থান রয়েছে)। উপরোক্ত এই চারটি মেয়েকে নিয়েই একটি মেয়ে তার মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দগুলো বলে থাকে। তাই মেয়েদের বোঝা আসলেই অনেক দুস্কর হয়ে পরে। কারণ মানুষ সমাজ তথা পুরুষশ্রেনী সর্বদা একজন নারীকেই দেখেন, কিন্তু তার ভিতরের বাকি ৩ জন নারী সম্পর্কে তিনি অবগত থাকেন না কখনোই।

মেয়েদের সবচেয়ে কমন সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অধিক প্রেম, অথবা প্রেম টিকিয়ে রাখার জন্য নানারকম মিথ্যাচার এবং অজুহাত। সবচেয়ে বড় এবং কমন বিষয়টা হচ্ছে, “নিজের প্রেমিকের সামনে বারবার নিজেকে পারিবারিক ভাবে অত্যাচারিত হিসেবে প্রদর্শন, প্রেমিক ব্যতিত জীবনে কিচ্ছু নেই, অথবা মা-বাবা অত্যাচার করিয়া মেরে ফেললো” টাইপ একটি অতিকায় নাটকীয় মিথ্যাচার করা। এর কারণ একটাই মেয়েরা সর্বদাই আদুরে এবং সেবাদাসী হয়ে থাকতে পছন্দ করে। আর এজন্যই তার এই কর্তা বা প্রেমিককে বানিয়ে বানিয়ে হাবিজাবি শুনিয়ে দেয়া, যাতে সেই কর্তা বা প্রেমিক তাকে অবহেলা করতে না পারে…

কিন্তু মেয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুলে যায় যে এই বানিয়ে বানিয়ে বলা কথাগুলো যে অপরপক্ষ সহজেই বুঝতে পারে। এছাড়াও মেয়েরা যখন নিজেরাই নিজেদের পরিবার নিয়ে এমন সব কথা বলে, তখন কিভাবে তারা আশা করে যে অন্য একটি পরিবারের ছেলে তাদেরকে আশ্রয় দিবে?

একের অধিক প্রেম করা এবং প্রেমে ধোঁকা খাওয়াটাও এযুগের মেয়েদের কাছে এখন কমন ব্যাপার। সম্পর্কগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বেশিরভাগ মেয়েরা এত সস্তা আর কুরুচি সম্পূর্ণ ছেলেদের পছন্দ করে, যা আসলেই বেমানান। অন্যদিকে ছেলেরা নিজেদের চেয়ে ভালো ও স্মার্ট পড়াশোনা জানা মেয়েদেরকেই প্রেমিকা হিসেবে গ্রহণ করে। আজ পর্যন্ত কোনো বিবাহ বিজ্ঞাপনে এমনটা লেখা দেখেছেন – “কালো, মোটা, খাটো, অল্পশিক্ষিত বা একেবারেই অশিক্ষিত, বংশমর্যাদাহীন পাত্রী চাই”? দেখেছেন কোথাও?

মেয়েরা এই প্রেমের সম্পর্কে অতীত প্রেমের ইতিহাসের বর্ণনা এবং সে কত ভালো ছিলো সেগুলো বর্তমান প্রেমিককে বলতে বলতে নিজেদের মধ্যকার সময়গুলো পার করে দেয়, যার ফল স্বরূপ প্রেমে ব্রেকাপ এবং আবারো ইতিহাসের পদার্পন। অনেক সময় দেখা যায়, একটা মেয়ে তার প্রেমিকের সাথে ভাঙ্গনের পর নিজেকে দোষারোপ করা, ঘুমের ওষুধ খাওয়া, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ইত্যাদি কাজগুলো অনায়াসে করতে পারে। কিন্তু নিজেকে নিজে শক্ত ও মজবুত একটি মেয়ে হিসেবে তৈরি করতে পারেনা।

এখন মধ্যবয়সী মেয়ে বা আন্টিদের কথায় আসি, ছেলের বউয়ের কোনে বান্ধবী ডিভোর্সী, তা নিয়ে বলার সময় একবারও তাদের মনে হয় না যে, “আমার মেয়ে গত দুইরাত বাসায় কাউকে কিছু না জানিয়ে বাইরে ছিলো !”

মেয়ে সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট বা বান্ধবীর বাসায় আড্ডা দিয়ে রাত ১০টায় ফিরেছে; সে ভালো ! কিন্তু কোনো মেয়ে বহুদিনের প্রেমিকের সাথে ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে, তো এই মেয়ে গেছে !

আবার রাত ১০টায় অফিস থেকে ফেরা মেয়েটার অফিসে কারো সাথে খারাপ সম্পর্ক আছে, এই কথাও বলে বেড়াতে তাদের বাধেনা। আন্টিরা তো অনেকেই আবার জানেন না যে, আংকেলরা ম্যারিড ব্যাচেলর হয়ে আছেন। এই বিবাহিত ব্যাচেলর যে তাদের মেয়ের বয়সী মেয়েদের গোপনে মেসেজ করেন বা ঘুরতে যান, আন্টিরা তা জেনেও না জানার ভাব করেন। আর জানলেও পরবর্তীতে ওই মেয়ের ১৪x১৪ জেনারেশন উদ্ধার হয়ে যায়।

অপরদিকে পরকিয়ার কেসগুলো ঘেঁটে দেখুন, আপনাদের তখন মনে হবে, আন্টিদের নিয়ে কি জ্বালা আংকেলদের ! সো আংকেল তো এমনটা করবেই; করাটা স্বাভাবিক !

হ্যাঁ, আসলেই তো করবে। অান্টিরা আংবেল বাসায় আসার সাথেই শুরু করেন, “এটা লাগবে সেটা লাগবে, অমুক তমুকরে এইটা কিনা দিসে, আমাকে কিনে দাও, পাশের বাসার ভাবী উমুক করসে, ওই মেয়ে এরকম চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে, আল্লাহগো ছেলেরে নিয়ে স্কুলে এই স্লিভলেস ব্লাউজ পরে কেমনে গেসে মাগি বলো তো?”

কিন্তু অান্টিরা ভুলেই যায় যে, এভাবে অমুক তমুকের বউকে নিয়ে বলতে বলতে আন্টি নিজেই তাদের ব্যাপারে আংকেলদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে ! পাশের বাসার ভাবীর অমুকের সাথে তমুক করার কথা জানাতে গিয়ে আড়চোখে ভাবীকে ঝালিয়ে নেয়ার কাজে আংকেলকে সাহায্য করা হচ্ছে ! কোন মেয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে, সেটা জানাতে গিয়ে তার সাথেই চ্যাটিং করার উৎসাহ দেয়া হচ্ছে ! স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে যে ক্লিভেজের সম্পর্ক থাকে, তা আন্টিরা উল্লেখ না করলেও আংকেলরা সে সম্পর্কে ঠিকই খোঁজ পেয়ে যাচ্ছে ! অন্যদিকে হাতেনাতে ফল পেলেও তারা সেবাদাসী থেকে উঠতে না পেরে উল্টো কলুপ আটকে বলবে, স্বয়ং ভগবানের তো ভুল হয়, সেখানে এ তো আমার স্বামী ! অহহ ভুলেই গেছিলাম, ঈশ্বর তো স্বয়ং পুরুষ আসনে অধিষ্ঠিত !

এখন প্রাতিষ্ঠানিক কথায় আসি…

ছোটবেলায় ছেলে-মেয়েদেরকে ‘মানুষ’ কি, তা শেখানো হয় না। বরং শেখানো হয় নারী কি ! শেখানো হয়, মেয়েদের সাথে কথা বললেই সেটা প্রেম-ভালোবাসা। শেখানো হয়, মেলায় যে মেয়েরা যায় তারা খারাপ। উচ্চস্বরে হাসা মেয়েরাও খারাপ। মেয়েদের অন্তবাস দেখা গুনাহ। মেয়েদের শরীরে হাত দিলে মেয়ে অপবিত্র হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু এর ফলাফল গুলো কি জানেন?

“কোনো মেয়ে একটু হেসে কথা বললেই ছেলেদের আজন্ম ধারণা তার সাথে প্রেম হয়েই গেলো ! মেলায় তো খারাপ মেয়েরাই যায়, সুতরাং তাদেরকে নিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেললে দোষের কিছু নেই। অন্তবাস দেখা যেহেতু গুনাহ, তাইলে তো আরো বেশি বেশি অমান্য করা উচিৎ। আর উচ্চস্বরে হাসা মেয়েরা তো গনিমতের মাল, চাইলেই পাওয়া যায় !”

জ্বি, আপনার আমার ঘরের পুরুষেরা এইগুলো শুনে, দেখে, শিখে বড় হয়েছে। এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও আমরা একই বীজ বপণ করে যাচ্ছি।

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের একটা উক্তি ছিলো,  “ফুর্তি করার দুইটি বিষয় হচ্ছে মদ ও মেয়ে, আর এই দুটোর মূল্য নির্ধারণ হয় তার চাহিদা অনুযায়ী।”

স্যারের কথার সাথে মিল রেখেই বলতে পারি, মদের দাম তো উর্ধ্বমূখী। তাহলে নারীর দাম এত নিম্মমূখী এত ক্যান?

বাংলাদেশের নারী নির্যাতন কেসগুলোর উপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ নারী নির্যাতনের কেসগুলোই হয় ভুয়া ! বেগম রোকেয়ার ভগ্নীগণ কোনোদিন অর্ধাঙ্গিণী হতে পারেন নাই, আর পারবেও না। কারণ তারা সব সময় ঈশ্বর তথা পুরুষের সেবাদাসী হয়েই থাকতে চায়। আর হয়ত সেই কারণেই সকল গালিবাচক শব্দগুলো স্ত্রী লিঙ্গ ! কিন্তু পুংলিঙ্গ নিয়ে কোনো গালি নেই। অবশ্য এই গালি পরিবর্তনের জন্যও আমাদের মেয়েদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ তারা তো নিজেরাই দাসত্ব স্বীকার করে নিয়েছে…

একজন পুরুষ কেবলমাত্র অন্ন, বস্ত্র, সন্তান ও শারীরিক চাহিদা মেটাতে পারলেই তাকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে দেয়া যে কত বড় ভুল, তা আজও বুঝতে পারেনি আমাদের মেয়ে জাতি। আর পরিবর্তনের যে হাওয়া আসছে, তা যে খুব একটা সুখবর বয়ে আনতে পারবে এই মুহূর্তে এমনটাও মনে হচ্ছে না। তবুও আশাবাদী মানুষ হিসেবে পরিবর্তন দেখতে চাই। মেয়েরা নিজেদের আত্মসম্মান আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে শিখুক। জীবনযাত্রার পথে শুধু এই কামনাই থাকলো। আগে নিজেকে ভালবাসুন, নিজেকে সম্মান করুন। তাহলে অবশ্যই আপনি সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারবেন। সবাইকেও ভালো রাখতে পারবেন…

SHARE