ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ভারতবর্ষ অভিযানের চেষ্টা ও ব্যর্থতার গল্প

ক্রিস্টোফার কলম্বাস

১৪৫১ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কোন একদিনে ইতালির জেনোয়া শহরে জন্ম হয়েছিল ক্রিস্টোফার কলম্বাসের। বাবা তন্তুবায় ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। সেই সূত্রেই প্রাচ্য দেশের উৎকৃষ্ট পোশাক, নানান মশলা ও অফুরন্ত ধন-সম্পদ সম্পর্কে জানা ছিল কলম্বাসের।

ছেলেবেলা থেকে কলম্বাসের স্বপ্ন ছিল জাহাজ নিয়ে পাড়ি দিবেন ভারতবর্ষে আর ফিরে আসবেন জাহাজ বোঝাই হীরা মণি মুক্তা মাণিক্য নিয়ে। কঠোর পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী কলম্বাসের অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে ভাগ্য ছিল প্রতিকূল, তাই অনেক কষ্টে জীবন ধারণ করতেন কলম্বাস।

কলম্বাসের ভাই লিবসন শহরে বাস করত, ভাইয়ের ডাক পেয়ে কলম্বাস চলে যান লিবসন শহরে। লিবসন শহরে বসবাস শুরু করার সময় কলম্বাসের বয়স ২৮ বছর।

লিবসন শহরে ছোটখাটো একটা কাজ করতেন কলম্বাস, কাজের অবসরে মাঝেমধ্যে গীর্জায় যেতেন কলম্বাস।
একদিন গীর্জায় পরিচয় হয় ফেলিপা মোঞিস দ্য পেরেস্ত্রেল্লো নামের এক তরুণীর সাথে। ফেলিপা’র বাবা বার্থলোমিউ ছিলেন সম্রাট হেনরির নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

ফেলিপা’র সাথে পরিচয় কলম্বাসের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

পরিচয়ের কিছুদিন পরই ফেলিপা কে বিয়ে করেন কলম্বাস, বিয়ের পর শ্বশুরের গৃহেই বাস করতেন কলম্বাস।
শ্বশুরের কাছে শুনতেন সমুদ্র অভিযানের রোমাঞ্চকর সব কাহিনী। অন্যসময় লাইব্রেরীতে বসে পড়তেন দেশবিদেশের ভ্রমণ নানান কাহিনী।

মার্কো পেলোর চীন ভ্রমণের ইতিবৃত্ত পড়ে প্রাচ্য দেশে যাবার স্বপ্ন নতুন করে জেগে উঠল কলম্বাসের। কলম্বাসের রোমাঞ্চকর অভিযানের দুরন্ত আকাঙ্ক্ষা ও স্বর্ণ তৃষ্ণা এর পেছনে কাজ করছিল। তখনকার মানুষের ধারনা ছিল প্রাচ্য দেশের রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে সোনা রূপা। সে দেশের মানুষের কাছে তার কোন মূল্যই নেই। ইচ্ছে করলে জাহাজ বোঝাই করে সোনা রূপা নিয়ে আসা যায়।

তখনকার সময়ের বিখ্যাত ভূগোলবিদ Pagolo Toscanelli কে চিঠি লিখলেন কলম্বাস। কলম্বাসের চিঠির জবাবে Pagolo লেখেন –

“তোমার মনের ইচ্ছার কথা জেনে আমি আনন্দিত হলাম। আমার তৈরি সমুদ্র পথের একটা নকশা পাঠালাম। যদিও এই নকশা নির্ভুল নয় তবুও এই নকশার সাহায্যে প্রাচ্যের পথে পৌছতে পারবে। যেখানে ছড়িয়ে আছে অফুরন্ত হীরে জহরৎ সোনা রূপা মণি মুক্তা মাণিক্য।”

Pagolo এর চিঠি পেয়ে কলম্বাসের মনের সব সংশয় দূর হয়ে গেলে কলম্বাস তাঁর যাত্রার প্রস্তুতি আরম্ভ করেন।

কলম্বাসের ইচ্ছার কথা শুনে সবাই অবাস্তব অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিল। মানুষজন কলম্বাসকে নিয়ে উপহাস করলো, ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করলো সবাই। কেউ তাঁর সাহায্যে বা সমর্থনে এগিয়ে এলো না।

কলম্বাসের অনুরোধে স্পেনের রানী ইসাবেলা সহৃদয় বিবেচনার আশ্বাস দিলেও সম্রাট ফার্দিনান্দ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এরমধ্যে কলম্বাসের স্ত্রী ফেলিপা অসুস্থ হয়ে কিছুদিন পর মারা যান। কলম্বাসের জীবনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, এবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁর অভিযানে। জাহাজ, নাবিক ও অর্থের জন্য দেশের প্রত্যেক ধনী ব্যক্তির দরজায় ঘুরে বেড়ালেন।

কলম্বাসের দাবী ছিল, যে দেশ আবিষ্কার হবে, তাঁকে সে দেশের ভাইসরয় করতে হবে আর রাজস্বের একটা অংশ দিতে হবে।

প্রথমে দু-একজন সম্মতি দিলেও কলম্বাসের দাবীর কথা শুনে সবাই তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তখন কলম্বাসের সাথে পরিচয় হয় ফাদার পিরেজ-এর। ফাদার পিরেজ ছিলেন রাজপরিবারের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও রানী ইসাবেলা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।

রানী ইসাবেলা কে কলম্বাসের ইচ্ছার কথা ফাদার নিজে বললেন এবং অনুরোধ করলেন কলম্বাস কে সাহায্য করতে। ফাদারের কথা ফেলতে পারেনি রানী ইসাবেলা। ফাদারের চিন্তা ছিল নতুন দেশ আবিষ্কারের পাশাপাশি অনেক মানুষকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার পুণ্য অর্জন করা যাবে।

ফাদার পিরেজ ছাড়াও আরও কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি কলম্বাসের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। কলম্বাসের সব অনুরোধ স্বীকার করে নিলেন সম্রাট। ১৭ এপ্রিল ১৪৯২ তাঁদের মধ্যে চুক্তি হল। কলম্বাসকে নতুন দেশের শাসনভার দেয়া হবে ও অর্জিত সম্পদের এক দশমাংশ অর্থ দেওয়া হবে। সম্রাটের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ৩টি জাহাজ নির্মাণ করেন কলম্বাস। যারমধ্যে ১০০টনের সান্তামারিয়া, ৫০টনের পিন্টা ও ৪০টনের নিনা। জাহাজ তৈরি ঠিকঠাক ছিল, সমস্যা দেখা গেলো নাবিক সংগ্রহের সময়। কলম্বাসের সাহায্যে এগিয়ে এল পিনজন ভাইরা ও কিছু বিশিষ্ট লোক। তাদের সহযোগীতায় মোট ৮৭জন নাবিক যোগাড় করতে পেরেছিল কলম্বাস।

অবশেষে ৩আগস্ট, ১৪৯২ তিনটি জাহাজ নিয়ে অজানা সমুদ্রে পাড়ি জমান কলম্বাস। সেদিন বন্দরে উপস্থিত বেশিরভাগ মানুষ ভেবেছিল কলম্বাস আর ফিরে আসতে পারবে না সেই অজানা দেশ থেকে।

জাহাজ নিয়ে ভেসে চললেন কলম্বাস, চারদিকে শুধু পানি আর পানি। দিনের পর দিন ভেসে চলার পরও কোন স্থলের দেখা পাওয়া যায়নি। নাবিকরা অধৈর্য হয়ে জাহাজ ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। তখন কলম্বাসের চোখে পড়ে জলে ভেসে যাওয়া ভাঙা গাছের ডাল ও সবুজ পাতা। এসব থেকে অনুমান করেন যে স্থলের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছেন। নাবিকদের থেকে একটা দিনের প্রার্থনা করেন কলম্বাস।

দিনটি ছিল ১২অক্টোবর, নাবিক রোডারিগো প্রথম দেখলেন স্থলের চিহ্ন। আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠলেন সকলে।
পরদিন কলম্বাস নামলেন বাহমা দ্বীপপুঞ্জের এক অজানা দ্বীপে। পরবর্তীকালে কলম্বাস এই দ্বীপের নাম দেয় সান সালভাদর (বর্তমান নাম ওয়েস্টলিং আইল্যান্ড)। এই দিনটি আজও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বাস দিবস হিসাবে উদযাপন হয়।

কলম্বাস ভেবেছিলেন তিনি এশিয়ায় এসে পৌঁছেছেন যেখানে অফুরন্ত সোনাদানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু কোথায় সেই সম্পদ?

দিনের পর দিন খোজ করেও সোনা-দানার কোন চিহ্ন মিলল না। কলম্বাস গেলেন কিউবা ও হিস্পানিওয়ালাতে দ্বীপে। কলম্বাস স্থির করেন হিস্পানিওয়ালাতে সাময়িক আস্তানা স্থাপন করে ফিরে যাবেন স্পেনে এবং বিপুল সংখ্যক লোক নিয়ে ফিরে এসে খোজ করবেন সোনা-দানার। হিস্পানিওয়ালাতে সাময়িক আস্তানা গড়ে তুলে সেখানে ৪২ নাবিকের থাকার ব্যবস্থা করে কলম্বাস রওনা হলেন মাতৃভূমির পথে। নতুন দ্বীপে পৌছনোর প্রমাণ সরূপ কিছু স্থানীয় আধিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

খালি হাতে ফিরে এলেও দেশে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন কলম্বাস। তাঁর সম্মানে রাজা-রানী বিরাট ভোজের আয়োজন করলেন। স্বয়ং পোপ কলম্বাসকে আশীর্বাদ করে ঘোষণা করলেন নতুন আবিষ্কৃত সমস্ত দেশ স্পেনের অন্তর্ভুক্ত হবে।

সম্রাট ফার্দিনান্দ নতুন অভিযানের আয়োজন করলেন। বিরাট নৌবহর, অসংখ্য লোক নিয়ে ১৪৯৩ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর কলম্বাস আটলান্টিক পার হয়ে দ্বিতীয় সমুদ্র অভিযানে যাত্রা করলেন। দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার পর কলম্বাস পৌঁছলেন হিস্পানিওয়ালতে। সেখানে গিয়ে যা দেখলেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না কলম্বাস। রেখে যাওয়া নাবিকদের একজনও জীবিত নেই। কিছু নাবিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য মারা গেছে ও বাকীরা স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে মারা পড়েছে।

এই দ্বিতীয় অভিযানের সময় কলম্বাস চারদিকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেও নতুন কিছু দ্বীপ আবিষ্কার করা ছাড়া কোনোপ্রকার ধনসম্পদের সন্ধান পেলেন না। ধনসম্পদ না পেয়ে কলম্বাস জাহাজ বোঝাই করে স্থানীয় আদিবাসীদের দাস হিসেবে বন্দী করে স্পেনে পাঠালেন। কলম্বাসের এই কাজকে অনেকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করতে পারল না। তাছাড়া আদিবাসীদের বিরাট অংশ নতুন পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পেরে অল্পদিনে মারা পড়ে। ইসাবেলা কলম্বাসের এই কাজকে অন্তর থেকে সমর্থন করেনি। এই সংবাদ কলম্বাসের কাছে পৌঁছে গেলে তিঁনি আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করলেন না। আড়াই বছর পর ১৪৯৬ সালের ১১ই জুন ফিরে এলেন স্পেনে।

প্রথমবারের মত এবার কোনো সম্বর্ধনা পেলেন না কলম্বাস। তবুও মনোবল নষ্ট হয়নি তাঁর !

নতুন অভিযানের জন্য আবেদন জানালেন কলম্বাস। প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ থাকলেও শেষপর্যন্ত সম্মতি দিলেন সম্রাট ফার্দিনান্দ।

১৪৯৮, ৩০শে মে তৃতীয়বারের মতো অভিযান শুরু করলেন কলম্বাস। এবার তাঁর সঙ্গী হল তার পুত্র এবং ভাই।
কলম্বাসের জীবনের সৌভাগ্যের দিন ক্রমশই অস্তমিত হয়ে এসেছিল। হিস্পানিওয়ালার স্থানীয় মানুষেরা ইউরোপিয়ানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কলম্বাস কঠোর হাতে অত্যাচারী শাসকের মতো বিদ্রোহ দমন করেন। শত শত মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

কলম্বাসের সহযোগীরাও তার কাজে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। সম্রাটের কাছে অভিযোগ উঠলো, কলম্বাস স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

সম্রাট ফ্রান্সিক্যে দ্য বোবদিলা নামে এক রাজ কর্মচারীকে সৈন্যসামন্ত সহ পাঠালেন কলম্বাসের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য। কয়েকদিন যাবত অনুসন্ধান করে রাজ্য স্থাপনের কোন অভিযোগ না পেলেও কলম্বাসের বিরুদ্ধে নির্বুদ্ধিতার অভিযোগ আনা হয়। কারণ কলম্বাস কোন সম্পদশালী দেশ আবিষ্কার করার পরিবর্তে সম্পদহীন দেশ আবিষ্কার করেছেন। যার জন্য সম্রাটের বিরাট পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়েছে। এই অভিযোগে প্রথমে কলম্বাসের ভাই ও পুত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে কলম্বাসকে গ্রেপ্তার করে শৃঙ্খলিতে করে নিয়ে যাওয়া হয় স্পেনে। তাঁকে রাখা হল নির্জন কারাগারে। সেখান থেকেই রানী ইসাবেলা কে চিঠি লিখেন কলম্বাস।

রানী ইসাবেলা ছিলেন দয়ালু প্রকৃতির। তাছাড়া কলম্বাসের প্রতি বরাবরই তাঁর ছিল সহানুভূতিবোধ। তাঁর চিঠি পড়ে তিনি মার্জনার আদেশ দিলেন।

পঞ্চাশ বছরে পা দিলেন কলম্বাস, শরীরে তেমন জোর নেই কিন্তু মনের অদম্য সাহসে ভর দিয়ে চতুর্থ বারের জন্য সমুদ্র যাত্রার আবেদন করলেন কলম্বাস। সম্রাট সম্মতি দিলেও হিস্পানিওয়ালতে প্রবেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।

১৫০২সালে (সঠিক দিনটি জানা যায়নি) কলম্বাস তাঁর ৪র্থ তথা শেষ সমুদ্র যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল আরো পশ্চিমে যাবেন। পথে তুমুল ঝড় উঠলে নিরুপায় কলম্বাস আশ্রয় নেয় এক অজানা দ্বীপে। কলম্বাস পৌঁছেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক দ্বীপে। সেখান থেকে ফিরে যান জামাইকা দ্বীপে। ক্রমশই তাঁর দেহ ভেঙে পড়ছিল। অজানা রোগে তাঁর সঙ্গীদের অনেকে মারা গিয়েছিল। দুইবছর পর নিরুৎসাহিত মনে স্পেনে ফিরে এলেন কলম্বাস।

এরপর আর মাত্র দু’বছর বেঁচে ছিলেন। যদিও অর্থ ছিল কিন্তু মনের শান্তি ছিল না। রাজ অনুগ্রহ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছিলেন। তাঁর আবিষ্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করার ক্ষমতা দেশবাসীর ছিল না।

১৫০৬ সালে ভ্যাসাডোলিড শহরে এক সাধারণ কুটিরে সকলের আগোচরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কলম্বাস। সেখান থেকে তাঁর মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে ডেমিঙ্গোতে সমাধি দেওয়া হয়।

Comments

comments