পাবলো এস্কোবার : ইতিহাসের একমাত্র কোকেন সম্রাট !

পাবলো এস্কোবার
নারকোস সিরিজে পাবলো এস্কোবার চরিত্রে ওয়াগনার মোরা

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে মাদক। আর মাদক শব্দটি উচ্চারিত হলেই অবধারিতভাবে ভেসে আসে একটি নাম ‘পাবলো এস্কাবার’ দ্য কিং অফ কোকেন। পাবলো এস্কোবারের পরিচিতি, কর্মকান্ড, পরিনাম সম্পর্কে আমাদের আজকের এই পোস্ট। চলুন একনজরে দেনে নেয়া যাক কে এই কোকেন সম্রাট, আর কিভাবেই বা উত্থান পতন হয়েছিলো তার !

পাবলো এস্কোবার : দ্য কিং অফ কোকেন

পুরো নাম পাবলো এমিলিও এসকোবার গাভিরিয়া । ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরের ১ তারিখে কলম্বিয়ার এন্টিওকিয়া প্রদেশে রিওনিগ্র শহরে জন্মগ্রহণ করেন পাবলো এস্কোবার। কলিম্বিয়ান এই ড্রাগ লর্ডের ডাক নাম ছিলো, ‘দ্য কিং অফ কোকেন’ অর্থাৎ ‘কোকেনের রাজা’। গডফাদার তো, কেউ আবার চিনতো “দ্য লর্ড” অথবা “দ্য বস” নামে। সবচেয়ে বেশী তাকে ডাকা হতো ‘ডন এস্কোবার’ নামে।

পাবলো এস্কোবারের অনৈতিক কর্মকান্ডের শুরু এবং অন্যান্য

পাবলো এস্কোবারের আইন ভঙ্গের হাতে খড়ি হয় বয়স যখন দশ বারো ছুঁই ছুঁই, তখনই। গভীর রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়তেন তিনি। চলে যেতেন কবরস্থানে। চুরি করতেন সমাধি-ফলক। এই সমাধিশিলা আবার বিক্রি করে দিতেন কোনো চোরাকারবারীর হাতে অথবা সমাধিফলকের দোকানে। এভাবেই শুরু হয়েছিলো কলম্বিয়ার সবচেয়ে ডেডলিয়েস্ট ব্যক্তির। পাবলো মিলিয়নিয়ার হয়ে গিয়েছিলেন মাত্র ২২ বছর বয়সেই।কিডন্যাপিং, মার্ডার, ট্রাফিকিং, এমন কিছু বাকি নেই, যেটা পাবলো করেননি। পাবলো বুঝে গিয়েছিলেন, উপরে উঠতে হলে তাঁকে সবাইকে হটিয়েই উঠতে হবে। সেজন্য পাবলোর ছিলো নিখুঁত গেম প্ল্যান। পাবলোর পথে যে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে, তাকেই মরতে হবে।এটা অলিখিত নিয়ম। মুভিতে গ্যাংস্টারদের যে রমরমা থ্রিলিং লাইফস্টাইল দেখানো হয়, পাবলো’র লাইফস্টাইল ছিলো তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি ইন্টেরেস্টিং। পুরোপুরি মাস্টারমাইন্ড স্মুথ ক্রিমিনাল। জাজ থেকে শুরু করে কলিম্বিয়ার স্ট্রীটের সমস্ত মানুষ ছিলো পাবলোর পকেটে। পাবলো ঘুষ দিয়ে কিনে ফেলেছিলো কলিম্বিয়ার পুরো ল’ এন্ড অর্ডার। কাউকে হাত করার সময় পাবলো’র সবচেয়ে বিখ্যাত ডায়ালগ ছিলো – ‘লাতা ও প্লোমো’। অর্থাৎ ‘সিলভার অর লেড’। সোজা কথায় “টাকা নাও অথবা বুলেট খাও” !

পাবলো এস্কোবার
আসল পাবলো এস্কোবার

খুব ছোটবেলা থেকে কলিম্বিয়ার ভায়োলেন্সের মধ্যে বেড়ে ওঠা পাবলো এস্কোবারের স্বপ্ন ছিলো একদিন পার্লামেন্ট মেম্বার হবেন। পৌঁছেও গিয়েছিলেম স্বপ্ন পূরণের অনেকটা কাছাকাছি। শেষমেশ আরেকজন পার্লামেন্ট মেম্বার রদ্রিগো লারা বনিয়াস পাবলোর ড্রাগ কার্টেইল লাইফ নিয়ে আপত্তি তুললে পাবলোর স্বপ্ন ভেস্তে যায়। পাবলো রাগে-ক্ষোভে অন্ধ হয়ে যান। রদ্রিগোকে ব্যক্তিগত এসাসিন দিয়ে হত্যা করান। পাবলো সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেন কলিম্বিয়ান সরকারের সাথে। পাবলোর এই রাগের কারণে প্রাণ যায় প্রায় ৪০০০ সাধারণ মানুষের।

এস্কোবারের যত হত্যাকান্ড

পাবলো এসকোবার তার শত্রুকে দমন করবার জন্য নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যা তার নিজের ভাষায়- “PLATA O’ PLOMO” অর্থাৎ “SILVER OR LEAD” । সোজা কথায় প্রথমে তাদের বিশাল অংকের ঘুষ এর লোভ দেখানো হত এবং যদি প্রথমটিতে অর্থাৎ “PLATA OR SILVER” এ কাজ না হয় তখন তাদের পরিণতি ছিল “PLOMO OR LEAD” অর্থাৎ এসকোবার তখন তার শত্রুকে পরিবার সহ খুন করবার সরাসরি নির্দেশ দিতেন। এসকোবার কত খুন এর জন্য দায়ী তা অজানা থাকলেও বলা হয়ে থাকে সে কয়েক হাজার খুন এর জন্য সরাসরি দায়ী।

“Sometimes I am God, When I say a man dies. He dies that same day.” – Pablo Escobar

কলম্বিয়াতে তখন বলা হত, “তুমি যতই ক্ষমতাশালী ও গুরুত্বপূর্ণ হওনা কেনো, যদি এসকোবার তোমাকে খুন করতে চায়, কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।“ এসকোবার এর নৃশংসতার শিকার ছিল বিচারক, সাংবাদিক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ এমনকি নিজের দলের লোক পর্যন্ত। তার ভয়াবহ গাড়ি বোমা হামলার শিকার হয়ে অনেক নিরীহ নারী, পুরুষ, শিশু নিহত হয়েছিলো। তখন এটা বলা হত যে – “এসকোবার যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, যেকোনো শত্রুকে হত্যার নির্দেশ দিতে পারে।”

এই কুখ্যাত কোকেন সম্রাটের নৃশংসতার চরম নিদর্শন ছিল ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট ভবনে হামলা চালিয়ে ১১ জন বিচারককে হত্যা। এছাড়াও ১৯৮৯ এর ২৭শে নভেম্বর এসকোবার এর নির্দেশে একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে হত্যার জন্য “আভিয়াঙ্কা ফ্লাইট ২০৩” এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায় যাতে ১১০ নিরীহ যাত্রীর সবাই নিহত হয়। যদিও সেই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সেই ফ্লাইটে ছিলো না। এছাড়াও কলম্বিয়ার বিচারমন্ত্রি “রডরিগো লারা” -কে পাবলো এসকোবারের “কিলিং স্কোয়াড” খুন করে, কারণ লারা কলম্বিয়ান কংগ্রেসে এসকোবার এর বিরোধিতা করেছিলো। এসকোবার এর নির্দেশে “প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী” এবং “মাদক বিরোধী” লুই কার্লোস গালানকেও তার নির্বাচনী প্রচারনায় হত্যা করা হয়।

পাবলো এস্কোবার সম্পর্কে অদ্ভুত এবং মজাদার যত কিছু

  • প্রতিবছর তার আয়ের ১ বিলিয়ন ডলার “Store House” থেকে ইঁদুর খেয়ে ফেলত।
  • প্রতিমাসে তার টাকা বাধবার জন্য ২৫০০ ডলার খরচ করা হতো রবার ব্যান্ড কিনতে।
  • মেডেলিন এর অত্যন্ত দরিদ্র কয়েক হাজার অধিবাসীদের জন্য এসকোবার ৪৫০টি বাড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং এর অধিবাসীদের কোনো ভাড়া বা ট্যাক্স দিতে হতো না।
  • একবার শীতে তার পরিবারকে উষ্ণতা দেয়ার জন্যে পাবলো পুড়িয়েছিলেন ২ মিলিয়ন ডলার !
  • ১৯৮০ এর দশকে বিখ্যাত “FORBES” সাময়িকীতে পৃথিবীর সপ্তম ধনী হিসেবে নাম আসে এ কোকেন সম্রাটের।

পাবলো এস্কোবারের শেষ পরিনতি

১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে কোকেন ব্যবসায়ে একচেটিয়া আধিপত্য এর জন্য তাকে বলা হতো কিং অফ কোকেন। প্রতিপক্ষের কাছে তার ভয়াবহতা ও নৃশংসতা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। কলম্বিয়ান এ কোকেন সম্রাট পৃথিবীর অন্যতম সংগঠিত ও ভয়াবহ নৃশংস মাদক চক্র মেডেলিন কার্টেল এর প্রধান ছিলেন। ৭০ ও ৮০ এর দশকের সারা পৃথিবীর কোকেন ব্যবসার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো তার “মেডেলিন” চক্র। কলোম্বিয়াতে এ ধনী মাদক ব্যবসায়ীর ছিল “হাসিয়েণ্টা নেপলস” নামক বিশাল খামার বাড়ি, মাদক পরিবহনের জন্য নিজস্ব বিমান, নিজস্ব চিড়িয়াখানা, তার নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব “ARMS WING” কুখ্যাত এ মাদক সম্রাট ছিল কয়েক হাজার খুন এর সরাসরি নির্দেশদাতা। কলোম্বিয়ার বেশির ভাগ সৎ রাজনীতিবিদ, বিচারক, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা এই মাদক সম্রাটের ভয়াবহ উত্থান ও ক্ষমতাকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভালো চোখে দেখেনি। এসকোবার এর ক্ষমতা এতোটাই বেশি ছিল যে তাকে আইনের আওতায় আনা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। কলম্বিয়া সরকার তখন সাহায্য চান। আমেরিকা সরকারও চাইছিলো যেকোনো মূল্যে এস্কোবারকে গ্রেফতার করতে। কুখ্যাত এই ক্রিমিনাল ছিলেন একজন পুরোদস্তুর ফ্যামিলী ম্যান। দুই কন্যা এবং এক পুত্রকে ভালোবাসতেন সবচেয়ে বেশি। আমেরিকান স্পেশাল ফোর্স এবং কলিম্বিয়ান পুলিশ পাবলোকে আটকাবার জন্যে তার এই ভালোবাসা’র দূর্বলতাকে কাজে লাগায়। তার পরিবারকে আটক করে নজরদারীতে এবং পরবর্তীতে জিম্মি করে রাখা হয়। পাবলো দিশেহারা হয়ে পড়েন। অপোজিশন কার্টেইল এবং নতুন জন্ম নেয়া শত্রুপক্ষ ‘লস পেপে’ এসময় তার কাছের সমস্ত মানুষদের হত্যা করে। পাবলো একা হয়ে যান।

পাবলো’র পরিবারকে একটি হোটেলে আঁটকে রাখা হয়। পাবলো চেয়েছিলেন নিজের ভাগ্যে মৃত্যু থাকলেও তার পরিবারকে কলিম্বিয়ার বাইরে কোথাও পাঠিয়ে সেফ রাখতে। প্রতিদিন নানান জায়গায় আত্মগোপণ করলেও ছেলের সাথে ফোনে কথা বলতেন পাবলো। যুক্ত বাহিনী তার এই ফোনালাপ থেকেই তার লোকেশন ট্র্যাক করে।

যুক্তবাহিনী যখন পাবলোর আবাসস্থলে তাঁকে হত্যা করবার জন্যে অপারেশন চালায়। তখনো পাবলো ছেলের সাথে ফোনে ছিলেন। সৈন্যরা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকার পরও পাবলো শান্তভাবে ছেলেকে বিদায় দেন। কানের নিচে একটা গুলি ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয় তাকে। কিং অফ কোকেন হার মানে একটা বুলেটে। নিথর দেহটা পড়ে থাকে রাজকীয়ভাবেই…

Comments

comments

SHARE