জিয়া হত্যাকাণ্ড, মৃতদেহ রহস্য ও খুনিদের শেষ পরিণতি

জিয়া হত্যাকাণ্ড

৩০শে মে ১৯৮১, দিনটা ছিলো শুক্রবার। প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির রাত। জানালার কাচে আছড়ে পরছে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। এপাশে আরাম করে ঘুমাচ্ছেন এক ভদ্রলোক, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সময় ভোর চারটা। বৃষ্টি কমে এসেছে। রাতের সুনসান নীরবতা ভেঙে হঠাৎ একটি সামরিক গাড়িবহর তড়িঘড়ি করে ছুটে গেলো চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের দিকে। সার্কিট হাউজের গেট অতিক্রম করে গাড়ি থেকে নেমে রকেট লাঞ্চার থেকে সার্কিট হাউজের দেয়াল উদ্দেশ্য করে একটা রকেট ছুঁড়ে মারলো লে. কর্ণেল ফজলে হোসেন। দেয়ালে ফুঁড়ে তৈরি হলো যাতায়াতের পথ। সেই পথেই এগিয়ে গেলো আক্রমনকারী দলের ১৬ জন সদস্য। ততক্ষণে জিয়াউর রহমানের ঘুম ভেঙে গেছে। তিনি বুঝার চেষ্টা করছেন, কি হচ্ছে বাইরে…

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা

এই মিশনে যে ১৬ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেছে, তারা কেউই সেনাবাহিনীর সাধারণ কোনো সৈন্য/সদস্য নন, প্রত্যেকেই সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার ! এই দলের প্রধান ছিলো লে. কর্নেল মতিউর রহমান, লে. কর্নেল মাহবুব, মেজর খালেদ, এবং লে. কর্নেল ফজলে হোসেন।

ঘটনার আগের দিন জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরোধ মেটাতে। নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে ২৯শে মে রাতে স্থানীয় সার্কিট হাউজে ঘুমিয়ে ছিলেন জিয়াউর রহমান। ভোর হবার আগেই গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। খানিকবাদেই জীবনের শেষ ঘুম ঘুমাতে চলে যেতে হয় মেজর জিয়াকে…

আক্রমণের সময় অফিসারদের সাথে ছিলো ১১টি সাবমেশিনগান, ৩টি রকেট লাঞ্চার এবং ৩টি গ্রেনেড থ্রোয়ার। সার্কিট হাউজের ভেতরে ঢুকে তারা সবাই দুজন দুজন করে আটটি দলে বিভক্ত হয়ে খুঁজতে লাগলেন সেই মানুষটাকে, যাকে ধরার জন্যে আজকের এই অতর্কিত হামলা। মেজর মোজাফফর এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সর্বপ্রথম তাকে খুঁজে পান…

মোসলেহ উদ্দিন জিয়াকে তাদের সাথে সেনানিবাসে যাওয়ার আদেশ করেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব জিয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই সেখানে প্রবেশ করে কর্ণেল মতিউর রহমান। কোনোরকম কালক্ষেপন না করেই তিনি তার হাতে থাকা এসএমজি দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করেন জিয়াউর রহমানকে। অন্তত ২০টি বুলেট জিয়ার শরীরে বিদ্ধ হয় এবং মুহূর্তেই পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। শেষ হয় একটি অধ্যায়ের…

তৎকালীন পত্রিকায় জিয়ার মৃত্যুসংবাদ

জিয়ার মৃতদেহ কি খুঁজে পাওয়া গেছিলো ?

৩০শে মে ভোর রাতে জিয়া হত্যাকান্ডের ঘটনার পর সকালে সার্কিট হাউজে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা। তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউজে পাঠানো হয়েছিলো সেখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেবার জন্য।

এ বিষয়ে মেজর রেজা এভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, “কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে ডাকেন। ডেকে বলেন জিয়াউর রহমানের ডেডবডিটা কিছু ট্রুপস সাথে নিয়ে সার্কিট হাউজ থেকে বের করে পাহাড়ের ভেতর কোথাও কবর দেবার জন্য। আমি তখন তাকে বললাম, আমাকে অন্য কাজ দেন। তারপর উনি মেজর শওকত আলীকে ডেকে ওই দায়িত্ব দিলেন। তখন আমাকে ডেকে বললেন যে, তুমি এদের সাথে থাক এবং সাথে যাও। গিয়ে সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে আসবে। সার্কিট হাউজে যাবার পর আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি। উঠে দেখি সিঁড়ি বারান্দায় একটা ডেডবডি কম্বল দিয়ে ঢাকা আছে। পাশে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার ডেডবডি? সে বললো, এটা রাষ্ট্রপতির। আমি বললাম কম্বলটা খোল। সেটা খোলার পর দেখলাম, মাথাটা মেজর জিয়ার !”

কাছাকাছি দূরত্বেই পড়ে ছিল কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজের মৃতদেহ। জিয়ার মরদেহ দেখার পর সেখান থেকে চলে যান মেজর রেজা। অন্যদিকে মেজর শওকত আলী তার দলবল নিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ কবর দিতে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৭ মাইল দূরে রাঙ্গুনিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাশে পাহাড়ের ঢালুতে তাঁকে কবর দেয়।

কবরটি কি সত্যিই জিয়াউর রহমানের ?

‍নানান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরদিন ১ জুন ১৯৮১, জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ খুঁজতে বের হন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ। তাঁর সাথে ছিলো আরো কয়েকজন সিপাহী, একটি ওয়্যারলেস সেট এবং একটি স্ট্রেচার। তারা কাপ্তাইয়ের পথ ধরে রওনা হন। একটি অনুমানের উপর নির্ভর করে তারা নতুন কবরের সন্ধান করছিলেন। তখন উৎসুক গ্রামবাসীদের একজন এসে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তারা কি খুঁজছেন?’ ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সেনাবাহিনীর সৈন্যরা সম্প্রতি সেখানে কোনো ব্যক্তিকে দাফন করেছে কিনা? তখন গ্রামের লোকেরা একটি ছোট্ট পাহাড় দেখিয়ে দিয়ে বলেন, দুয়েকদিন আগে সৈন্যরা সেখানে একজনকে কবর দিয়ে রেখে গেছে।

গ্রামবাসী তখনো জানতেন না যে সেখানে কাকে কবর দেয়া হয়েছে ! তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন নতুন মাটিতে চাপা দেয়া একটি কবর। সেখানে মাটি খুঁড়ে তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরো দুই সেনা কর্মকর্তার মৃতদেহ দেখতে পান। ওই দিনই বেলা ১১টায় জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ কবর থেকে তোলা হয়।

বিকাল পৌনে ৪টায় বিমান বাহিনীর একটি বিমানে চট্টগ্রাম থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয়। তাঁর কফিনটি প্রেসিডেন্ট ভবনে আনার পর সেখানে বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকো সহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখান থেকেই তারা জিয়াউর রহমানকে শেষ বিদায় দেন।

জিয়াউর রহমানের কবরটি জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। তাঁর এই কবরটিকে অনেকেই “তথাকথিত কবর” বলে অাখ্যা দেন। জিয়া হত্যাকাণ্ডের সময় শোনা যাচ্ছিলো, গুলিতে তা‍ঁর শরীর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। আবার কেউ বলছিলো, হত্যাকারীরা নাকি তাঁকে হত্যা করে পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে কবর দিয়ে দেয়। সেই কথার উপর নির্ভর করেই অনেকে মনে করেন, সমাধির মৃতদেহটি জিয়াউর রহমানের নয় ! এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর আজো অজানা…

জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৮১ সালের এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন এই রাষ্ট্রনায়ক।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কোনোরকম ঘোষনা ছাড়াই পাকিস্তানি আর্মি ঢাকায় হামলা শুরু করলে চট্টগ্রামে মেজর জিয়া তার পাকিস্তানি অফিসারকে বন্দী করে বাঙালি সেনাসদস্যদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন। জেড ফোর্সের সর্বাধিনায়ক জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন করেন এবং যুদ্ধের পর বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় চার বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৮১ সালের ৩০শে মে তাকে হত্যা করা হয়…

জিয়া হত্যাকারীদের শেষ পরিণতি কেমন হয়েছিলো ?

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন চীফ অব আর্মি স্টাফ লেঃ জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত থাকেন। তিনি জিয়ার সহযোগীদের দ্বারা সংগঠিত অভ্যুত্থান দমন করেন। এরপর সরকার থেকে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পন করার নির্দেশ দেয়া হয়। সার্কিট হাউজের আক্রমনে নেতৃত্বদানকারী অফিসার ব্যতীত অন্যান্য সেনাসদস্য এবং অফিসাররা আত্মসমর্পন করে।

Assassinators of Ziaur Rahman
Assassinators of Ziaur Rahman

নেতৃত্বদানকারী অফিসাররা পার্বত্য চট্টগ্রামে পালিয়ে যাবার সময় সরকার কর্তৃক প্রেরিত বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। এদের মধ্যে গ্রেফতারের সময় কর্ণেল মতিউর রহমান এবং লেঃ কর্ণেল মাহবুব নিহত হয়…

জেনারেল মঞ্জুর এবং কর্নেল মতিউর রহমান যে গাড়ির বহরে পালিয়েছিলো, সেখানে ছিলেন মেজর রেজা। তার বর্ণনায় জানা যায়, যাত্রাপথে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর পর তারা সামনে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান। তারা লক্ষ্য করেন, সামনে কিছু সৈন্য পাহাড়ের দিকে ছুটোছুটি করছে। সেসময় জেনারেল মঞ্জুর গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাদের বহনকারী গাড়িটি হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। তখন তারা অন্য আরেকটি গাড়িতে করে পেছনের দিকে চলে আসেন। সেখানে একটি গ্রাম্য এলাকায় তারা গাড়ি থেকে নেমে হা‍ঁটা শুরু করেন। এলাকাটিতে চা বাগান ছিলো। জেনারেল মঞ্জুর চা বাগানের এক কুলির বাড়িতে যান। কারণ তার সন্তানরা ছিলো ক্ষুধার্ত। সেখানে জেনারেল মঞ্জুরের সন্তানদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। মঞ্জুর যখন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে খেতে বসলো, তখন তারা হঠাৎই কুকুরের অনবরত ডাক শুনতে পান। উঁকি দিয়ে দেখা গেলো, বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ি এলাকায় খাকি পোশাকের পুলিশ দেখা যাচ্ছে। তখন জেনারেল মঞ্জুর বললেন, আমি পুলিশের কাছে সারেন্ডার করবো !

পুলিশ সদস্যরা যখন সামনের দিকে এগিয়ে আসছিলেন, তখন জেনারেল মঞ্জুর জঙ্গলের ভেতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তিনি পুলিশের উদ্দেশে বলেন, “এইযে বাবারা তোমরা ওইখানেই থাকো। সামনে এসোনা। সামনে আসলে তোমাদের অসুবিধা হবে। আমি আসতেছি।” একথা বলে তিনি হনহন করে হেঁটে গিয়ে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেন। পুলিশ তাকে হাটহাজারী থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তিনি একজন আইনজীবীর জন্য আবেদন করলে তা নাকচ করে দেওয়া হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পুলিশের হেফাজত থেকে নিষ্কৃতি পেলেই সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করবে। তাই তিনি বারবার পুলিশের হেফাজতে থেকে চট্টগ্রামে জেলে প্রেরিত হওয়ার জন্য আবেদন করতে থাকেন। কিন্তু যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে উঠানো হয়, তখন সেনাবাহিনীর একটি দল থানায় গিয়ে উপস্থিত হয়। কিছুক্ষণ বিতর্কের পর ক্যাপ্টেন এমদাদ জেনারেল মঞ্জুরের হাত-পা বেঁধে প্রায় টেনেহিঁচড়ে তাকে গাড়িতে তুলে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হন। পরবর্তীতে কি ঘটেছিলো, সরকার তা কখনোই প্রকাশ করেনি। তবে রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষিত হয়েছিলো, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃংখল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয় ! বলা হয়, ক্ষুব্ধ সেনাসদস্যসের গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তে বের হয়ে আসে, মঞ্জুরের মৃতুর কারণ ছিলো পেছন থেকে মাথায় করা একটি গুলি। ফলে মঞ্জুরের মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যাবৃত হয়ে পড়ে।

মঞ্জুরের মৃতদেহ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টেই ছিলো। লাশটি কেউই দাবী না করায় দুতিনদিন পর মৃতদেহটি একটি অজ্ঞাত কবরে দাফন করা হয়। সেসময়কার সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ‘মেজর মঞ্জুরের স্ত্রী বেগম মঞ্জুর ঢাকায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খালেদা জিয়াকে এটা বুঝাতে সক্ষম হন যে, জিয়াকে মঞ্জুর হত্যা করেনি। এরপর খালেদা জিয়া মঞ্জুরের মরদেহ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফনের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে আবেদন করেন। পরে কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আবার তার মৃতদেহ দাফন করা হয়।’ তবে এসব তথ্য শুধু সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায়ই প্রকাশিত হলেছিলো। এর বাইরে আর কোথাও এটা প্রকাশিত হয়নি।

মেজর জেনারেল মঞ্জুর জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি আসলেই জিয়া হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন কিনা, সে সত্যটিও আজো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

১৯৯৫ সালে মঞ্জুরের বড় ভাই জেনারেল এরশাদ সহ আরো বেশ কয়েকজনকে মঞ্জুর হত্যায় দায়ী করে মামলা দায়ের করে। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যান্য পরিকল্পনাকারীদের সামরিক আদালতে বিচারের আওতায় আনা হয় এবং জেল ও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ১২ জন অফিসার, যারা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন করেছিলো, জিয়া হত্যাকাণ্ডে তাদের ভূমিকা থাকায় সামরিক আদালতে মাত্র ১৮ দিনের দ্রুত বিচারকার্যে ত‍াদেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৩তম মুক্তিযোদ্ধা অফিসার অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার জন্য দুই বছর পরে ফাঁসি দেওয়া হয়।

এই বিচারে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদেরকেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই বিচারকার্যটি আজো বিতর্কিত হয়ে আছে…

এই সামরিক ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে মোট ১৮ জন অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ১৩ জন মৃত্যদণ্ড এবং বাকি ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড লাভ করেন। এ অফিসারদের ১৯৮১ সালের ১লা থেকে ৩রা জুনের মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। মেজর জেনারেল আবদুর রহমানের সভাপতিত্বে ১০ই জুলাই ১৯৮১ থেকে ২৮শে জুলাই ১৯৮১ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলে সামরিক আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

এই আবদুর রহমানকে আবার ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৮৪ সালে সেখানেই রহস্যজনকভাবে তার মৃত্যু হয়।

এভাবেই জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাথে জড়িত এবং পরবর্তীতে সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত প্রত্যেকটা ব্যক্তি হারিয়ে যায় ইতিহাসের গহ্বরে…