মজার ছলে কাউকে ‘রোহিঙ্গা’ বলে ডাকছেন ?

রোহিঙ্গা

‘তুই শালা একটা রোহিঙ্গা’ – ইদানিং অনেককেই এধরণের কথা বলতে দেখা যায়। বন্ধুবান্ধবদের সাথে হাসিঠাট্টা করে বা নিছক মজার ছলে অনেকেই তাদেরকে রোহিঙ্গা বলে ডাকেন। ‍আবার রোহিঙ্গা শব্দটি নিয়ে বেশ ট্রল হতেও দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়াতে। ক‍াজটা আমরা ঠিক করছি? একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখা দরকার না? চলুন গভীরে যাই। অল্প কথায় জেনে নেই আরাকান ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায় সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু তথ্য…

আরাকান ও রোহিঙ্গা

আরাকান, যেনো ইতিহাসের বিস্ময়ভূমি! এককালে এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। বানিজ্যের কারণে বিশ্বব্যাপী ছিল রোহিঙ্গাদের পরিচিতি। এককালে বৌদ্ধ অধ্যুষিত থাকলেও পরবর্তীতে আরব অঞ্চলের বনিকগণ ব্যবসার জন্য আরাকান আসলে তাদের সংস্পর্শ পেয়ে অনেকেই ইসলাম কবুল করেন। এরপর সময়ের সাথে ইসলাম হয়ে উঠে আরাকানের সংখ্যাগুরুদের ধর্ম।

চলুন জেনে নিই, রোহিঙ্গা ও তাদের আবাসভূমি নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য…

রোহিঙ্গা ও তাদের আবাসভূমি

আরাকান : আরাকান অঞ্চল বঙ্গপোসাগরের তীরে অবস্থিত। এখানে রোহিঙ্গাদের বাস। তার পাশাপাশি রাখাইনরাও রয়েছে। তারা সংখ্যালঘু। বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা নেই বললেই চলে। নির্বিচার গনহত্যার ফলে প্রায় সকলেই দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আরাকান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এর তুলনা চলে কাশ্মীর, তিব্বত কিংবা দার্জিলিংয়ের সাথে। বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস না হলে গুগলে খোঁজ নিয়ে দেখুন। আরাকান পাহাড়ি অঞ্চল। তাই এর মাটির নিচে ব্যাপক খনিজ সম্পদ থাকার সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকরা।

জাতিসত্তা : রোহিঙ্গারা বাঙালির মতোই সংকর জাতি। তবে অনেকে তাদের জাতি মানতে নারাজ। কারণ তারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকান ছিলো অসাম্প্রদায়িক মুসলিম রাষ্ট্র! এর সীমানা ছিলো ফেনী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে শুরু করে একদম আজকের রাখাইন (সাবেক আরাকান) রাজ্যের শেষ সীমানা পর্যন্ত।

ধর্ম : রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশিরভাগ মুসলিম হলেও কিছু সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ রয়েছে।

সাহিত্য : রোহিঙ্গাদের সাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ। আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর, আব্দুল হাকিম সহ অনেক যুগশ্রেষ্ঠ কবিই আরাকানের। তাঁরা আরাকানে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁদের সাহিত্যমান বেশ উঁচু। প্রায় সব কবিতায়ই ফুটে উঠেছে দেশপ্রেম। এই যেমন –

“কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী,
রোসং নাম তার স্বর্ণ অবতারী।”
(উল্লেখ্য যে, রোসাং ছিল তৎকালীন আরাকানের রাজধানী)

গান : ইউটিউবে খুঁজলেই রোহিঙ্গাদের নিজস্ব গান, কাওয়ালি সহ অনেক ভিডিও পাওয়া যায়। গানগুলো যেমন চমকপ্রদ, সুরগুলোও চমকপ্রদ। এক কথায়, গানগুলো বেশ শ্রুতিমধুর।

খাদ্য ও পোশাক : রোহিঙ্গাদের খাদ্যাভাসের সাথে বাঙালী খাদ্যাভাসের বেশ মিল রয়েছে। তবে পোশাকে পুরোপুরি মিল নেই। রোহিঙ্গা পুরুষগণ লুংগি ও শার্ট ইন করে পরেন। পাঞ্জাবিরও বেশ চল রয়েছে। মহিলারা শাড়ি, থ্রিপিসের পাশাপাশি দোপাট্টা ও ঘাগড়া পড়েন।

বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা : রোহিঙ্গারা আছে বিশ্বজুড়ে। জেনে অবাক হবেন যে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সৌদিআরব, পাকিস্তান সহ অনেক দেশে তারা নাগরিকত্ব নিয়ে বাস করছেন। নাগরিকত্ব ছাড়াও আশ্রয়ে রয়েছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলোয়। বিশ্বাস না হলে পরিচিত প্রবাসী ভাইদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন। উত্তর পেয়ে যাবেন।

মিয়ানমারের রাজনীতিতে রোহিঙ্গাদের অবস্থান

একটা সময় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনীতিতে বেশ ভালো অবস্থানে ছিলো। মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনে বেশ ভাল ভূমিকা ছিলো রোহিঙ্গাদের। কিন্তু সামরিক জান্তা সরকার তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। ফলে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হারায় তারা।

অর্থনৈতিক অবস্থা : এক সময় বেশ ভালো অর্থনৈতিক অবস্থানে ছিলেন রোহিঙ্গারা। তবে বর্তমানে তা আর নেই। সরকারি নির্যাতনের মুখে সকল কিছু হারিয়েছেন তারা। আরাকানের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিপ্রধান। আরাকানের মাটি উর্বর হওয়ায় ব্যাপক শস্য উৎপাদন হত সেখানে। এমনকি আকিয়াব বন্দর দিয়ে সেসব শস্য রপ্তানীও হত। পাশাপাশি মৎস্য সম্পদে ভরপুর ছিলো আরাকান। তৃণভূমি থাকায় পশুসম্পদও বেশ সমৃদ্ধ ছিলো।

শিক্ষাব্যবস্থা : রোহিঙ্গারা স্কুল ও মাদ্রাসা উভয় ধরনের শিক্ষাই গ্রহণ করে। তবে মাদ্রাসায় পড়ার হার বেশি।

সবশেষে, আবারো সেই একটা কথাই মনে করিয়ে দিতে যাই, রোহিঙ্গারা মুসলিম। সব মুসলিম ভাই ভাই। তাছাড়া তাদেরও একটা গর্বের ইতিহাস রয়েছে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিনিয়ত তারা লড়ে যাচ্ছে। তাই এই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি নিয়ে ট্রল না করলেই বোধহয় ভালো হয়। মানবিক হউন 🙂

আরো পড়ুনঃ

SHARE