ফারিয়াকে নিয়ে আমাদের যত সমস্যা

নুসরাত ফারিয়া

নুসরাত ফারিয়া, সিনেমা পাড়ায় বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কিংবা সমালোচিত নামগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতেই থাকবে এই নামটা। বাংলা সিনেমার সঙ্গে যাদের মোটেও পরিচয় নেই, তারাও নুসরাত ফারিয়া নামটার সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু কিভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। শুরু করতে হবে সেখান থেকে যেখানে শুরু হয়েছিলো ফারিয়া’র ক্যারিয়ার। কারন ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন মিডিয়া পাড়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, সো কল্ড ‘সুশীল সমাজের’ চোখের কাঁটা এবং লাইক কামানো অনলাইন সেলিব্রেটিদের ট্রলের মধ্যমনি। এর কারনটা কি? কারন আর কিছুই নয়, বাঙালি মানেই কাঠি করার ওস্তাদ।

আড্ডা জমছে না? চলুন কাঠি করি। পত্রিকা বিকোচ্ছে না? চলুন কাঠি করি। অনলাইন পোর্টালে ভিউজ নেই? চলুন একটা গুজব ছড়িয়ে দেই। ইউটিউব চ্যানেলে ভিউয়ার নেই? চলুন রোস্ট করি। এই হচ্ছে আমাদের স্বভাব। তা নাহলে কেনো আমরা এরকম প্রতিভাবান এবং মোস্ট প্রবাবলি বর্তমান সময়ের উপযোগী সবচেয়ে পরিপূর্ণ প্যাকেজ নিজের মধ্যে নিয়ে এসেছে যেই মেয়েটা, তাকে আমরা ট্রল করি? প্রতিভাবান তো তিনি বটেই, তা নাহলে এই ছোট্ট ক্যারিয়ারে এতোগুলা হিট মুভির মাধ্যমে দুই বাংলা কাঁপানো নিশ্চই সম্ভব হত না।

এবার আসি কমপ্লিট প্যাকেজ কেনো বললাম সেই বিষয়ে…

একজন নায়িকার মধ্যে প্রথমেই আমরা কি দেখি, নিশ্চয়ই তার চেহারা কিংবা ফিগার। ফারিয়া’র চেহারা এবং ফিগার যেকোন ইন্টারন্যাশনাল নায়িকার চেয়ে কোন অংশেই কম না, এটা যেমন আপনি জানেন তেমনি আমিও জানি। হ্যাঁ, ফারিয়া’র ঠোঁট নিয়ে অনেককেই ট্রল করতে দেখেছি। কিন্তু তারা হয়তো জানেনা যে হালের ক্রেজ হিসেবে খ্যাত অনেক হলিউডি নায়িকারাই এখন কসমেটিক সার্জারি করিয়ে ঠোঁট চওড়া বানিয়ে নিচ্ছে এবং এটাই এখন ‘হট এ্যন্ড সেক্সি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ ফারিয়া’র এই ঠোঁট প্রকৃতি প্রদত্ত। সেই প্রকৃতি প্রদত্ত “হটনেস” নিয়ে ট্রল করা কতটা যুক্তিযুক্ত?

এবার আসি অভিনয়ে। এখানে ফারিয়া বারবার নিজেকে প্রমান করে যাচ্ছেন প্রত্যেকটা ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্রে ভিন্ন ভিন্ন ক্যারেকটার প্লে করার মাধ্যমে। যার প্রত্যেকটাই সাধারন দর্শক এবং চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নাচের প্রসঙ্গে আসা যাক। একজন প্রফেশনাল নায়িকা এবং নৃত্যশিল্পী’র নাচের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। ফারিয়া যদি শামীম আরা নিপা’র মত নাচতে না পারে, তবে নিপা ম্যাডামও ফারিয়া’র মত অভিনয় করতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। ফারিয়া তার প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রের গানে এবং বিশেষ করে আইটেম সংগুলোতে যতটা প্রয়োজন, ঠিক ততটাই নাচ প্রদর্শন করতে সার্থক হয়েছেন।

ফারিয়া’র বাচনভঙ্গি কিংবা উচ্চারন নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কেউ হয়তো নেই। কেননা তার ক্যারিয়ার শুরুই হয়েছিলো একজন আরজে হিসেবে। এবং বলাই বাহুল্য সেই সময়ে আরজে হিসেবে তিনি সব শ্রেনীর শ্রোতার প্রশংসা পেয়েছিলেন।

তাহলে তাকে ট্রল কেন করা হয়? মূলত দুইটা ইস্যু নিয়ে তাকে সারাবছরই ট্রলের স্বীকার হতে হচ্ছে, প্রথমটা হচ্ছে বস-২ সিনেমার ‘আল্লাহ্ মেহেরবান’ গান, এবং দ্বিতীয়ত সাম্প্রতিক সময়ে রিলিজ হওয়া তার নিজের কন্ঠে গাওয়া ‘পাটাকা’ নামক গান।

একটা গানের পেছনে কতগুলা মানুষের পরিশ্রম কিংবা অবদান থাকে বলতে পারেন? গীতিকার, সুরকার, কন্ঠশিল্পী এবং কোরিওগ্রাফার। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা হচ্ছেন প্রযোজক। যার লগ্নিকৃত অর্থে গানটা বানানো হচ্ছে, যার পছন্দ কিংবা অপছন্দের উপর ভিত্তি করছে এতোগুলা মানুষের পরিশ্রমের সার্থকতা। অথচ ‘আল্লাহ্ মেহেরবান’ গানের জন্যে এককভাবে ট্রলের স্বীকার হলেন ফারিয়া। কেন? ওইযে এ্যটেনশন সিকার বাঙালি মেন্টালিটি। কেউ উপরে উঠতে গেলে তার পা টেনে যে নিচে নামাতেই হবে, তা নাহলে পেটের ভাত হজম হচ্ছে না তো!

এবার আসি ‘পাটাকা’ গানের প্রসঙ্গে…

নুসরাত ফারিয়া’র কন্ঠ যথেষ্টই ভালো, সে গানের জগতে অল্পবিস্তর আনাগোনা করতেই পারে। আপনার আমার প্রিয়ে বলিউডি নায়িকারা যখন ‘ইন্সপিরেশন’ এর নামে হলিউডের নকল চালিয়ে দিচ্ছে তখন ফারিয়া’র নিজস্ব গ্ল্যামার শো-অফ করলে সমস্যাটা কোথায়? প্রশ্ন আসতে পারে ফারিয়া’র পোশাক নিয়ে। তার পোষাকের সাইজ ছোট। ভাই থামেন! ছোট পোষাক দেখতে যদি এতই লজ্জা পান, তাহলে হলিউড কিংবা বলিউড সিনেমার এতো ক্রেজ কেন এই দেশে? সেসব সিনেমার নায়িকারা নিশ্চই বোরকা পরে পর্দায় উপস্থিত হন না ! আর একটা মিউজিক ভিডিওতে নাচ কিংবা ভিজ্যুয়াল কেমন হবে তা কিন্তু গায়িকা বা মডেল নির্ধারন করেন না। এসব ঠিস করেন ডিরেক্টর, কোরিওগ্রাফার। আবার ড্রেস কি হবে সেটা ঠিক করার জন্যে থাকেন কস্টিউম ডিজাইনার। সুতরাং আপনার যেটা ভালো না লাগে সেটা এ্যভয়েড করেন, আর সমালোচনা যদি করতেই হয় সেটা যৌক্তিকভাবে করেন। শুধু শুধু নিজের দেশের সবচেয়ে জ্বলজ্বলে তাঁরকাকে বিশ্ব দরবারের সামনে ছোট না করলেও চলবে। আর তাছাড়া এই ছোট্ট দেশে তো ট্রল করার মতো ক্যারেক্টারের অভাব নেই!

আর হ্যা‍ঁ, সবশেষে জানিয়ে রাখি, ‘পাটাকা’ গানের মাধ্যমে উপার্যিত সমস্ত অর্থ যাচ্ছে পথশিশুদের শিক্ষার কাজে। এবার কি এটা নিয়েও ট্রল শুরু করবেন?

Comments

comments

SHARE