12 Angry men : ১২ জন রাগী মানুষের গল্প

12 Angry men

বারোজন মানুষ, একটি প্রাণ, একটি সিদ্ধান্ত, এবং একটি রুম !

ব্যাপারটা একটু খুলে বলি । একজন মানুষের প্রাণ বারোজন মানুষের হাতে । সেই ‘একজন মানুষ’ দোষী না নির্দোষ এটা নিয়েই কথা, তর্ক , আলোচনা , ঝগড়া , অপমান । বিভিন্ন বয়সের এবং বিভিন্ন চরিত্রের বারোজন মানুষ একটা আবদ্ধ রুমের ভিতর একটি মাত্র সিদ্ধান্তে আসার জন্য একেকজন একেক রকম যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন । একদম শ্বাসরুদ্ধকর ব্যাপার !

পরিচালক সিডনী লুমেট ১৯৫৭ সালে 12 Angry Men নামে এক অসাধারণ কোর্ট রুম ড্রামা নির্মাণ করেন । সিডনী লুমেট এর এটিই প্রথম পরিচালনা । এবং প্রথম সিনেমাতেই তিনি বাজিমাত করে দেখিয়েছেন ।

সংক্ষেপে সিনেমার কাহিনী সম্পর্কে একটু জেনা নেয়া যাক । ১৮ বছরের এক যুবক তার পিতাকে ছুরি মেরে খুনের দায়ে অভিযুক্ত হয় । মামলার রায় দেয়ার দায়িত্ব এসে পড়ে ১২ সদস্যের এক জুরি বোর্ডের উপড় । সমস্ত ফ্যাক্টস , সমস্ত যুক্তি – প্রমাণ খতীয়ে দেখে রায় দিতে হবে । ১২ জন জুরির রায় একই হতে হবে । হয় দোষী না হয় নির্দোষ । জুরি বোর্ডের উদ্দ্যেশে  জজ সাহেব আরো একটি প্রয়োজনীয় কথা বলে দেন । সেটি হচ্ছে কারো মনে যদি মামলার রায় নিয়ে কোন ‘যুক্তি সংগত সন্দেহ (Reasonable Doubt)’ থাকে তাহলে সে অভিযুক্ত যুবকের পক্ষে যথাযথ যুক্তি পেশ করে তাকে  নির্দোষ দাবি করতে পারে ।

12 Angry men সিনেমার জুরি বোর্ডের ১২ সদস্য

প্রাথমিক ভোটে জুরি বোর্ডের ১২ জনের মধ্যে ১১ জনই আসামীর বিপক্ষে রায় দেয় ।  ১১ জনই বলে আসামী দোষী । শুধুমাত্র একজন জুরি দাবি করলো আসামী নির্দোষ । তিনি হচ্ছেন আট নম্বর জুরি । তার কাছে মনে হলো ১৮ বছরের একটা তরুণ যে ছোটবেলা থেকেই সমাজে নির্যাতিত – নিপীড়িত হয়ে আসছে সে কখনো তার বাবাকে খুন করতে পারে না । এভাবে এত সহজেই সে কারো জীবণ-মরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না । পুনরায় সকল ফ্যাক্টস , সকল যুক্তি-প্রমাণ নতুন ভাবে খতিয়ে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সে একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায় । এভাবে একেক জনের যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে অজানা অনেক কিছুই বের হয়ে আসে । খুনের কথা বলতে গিয়ে বের হয়ে আসে অজানা অনেক কিছু যা আদালতে প্রকাশ পায় না । বের হয়ে আসে একেকজনের আসল চেহারা । আস্তে আস্তে সে চেহারা রূপ নেয় ভিন্ন আরেক চেহারায় । সংলাপের সুর পাল্টে যায় । একপর্যায়ে বের হয়ে আসে চরিত্রগুলোর বিক্ষুব্ধ-রাগী চেহারা ।

জুরি নম্বর ৮ তিনি একাই আসামীর পক্ষে হাত উঠিয়েছেন

শেষ পর্যন্ত আসামীর কি পরিণতি হয়? ১২ জন জুরি যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত গ্রহন করে? এসব জানতে হলে আপনাকে সিনেমাটি অবশ্যই দেখতে হবে ।

সিনেমার বিভিন্ন জায়গায় Reasonable Doubt কথাটির ব্যবহার দেখা যায় । চলুন জেনে নেয়া যাক আসলে এই Reasonable Doubt জিনিসটা কি ??

Reasonable Doubt বা যুক্তিসংগত সন্দেহ :  যুক্তিসংগত সন্দেহ হচ্ছে যখন একটি অপরাধমূলক আসামীর মামলা হয় , প্রসিকিউটর একটি যুক্তিসংগত সন্দেহের বিনিময়ে আসামীর দোষ প্রমাণ করেন । প্রমাণের একটি প্রধান কারন হচ্ছে একটি পক্ষের তুলনায় অন্য পক্ষের আরো বেশি প্রমাণ রয়েছে । প্রসিকিউটরের এই যুক্তিসংগত সন্দেহের মাধ্যমে আসামীর দোষ প্রমাণ করারকেই বলা হয় Reasonable Doubt । এটি Anglo-Saxon country (যে সব দেশে ইংরেজি কেই প্রধান ভাষা হিসেবে ধরা হয়) গুলোতে বহুল প্রচলিত একটি বিচার ব্যবস্থা । মার্কিন যুক্ত-রাষ্ট্রের যে কোন দেশেই এই Reasonable Doubt হচ্ছে একটি আদালতের সর্বচ্চ প্রমাণাদি । সেখানে সকল অপরাধ মূলক বিচারের প্রমাণ হয় Reasonable Doubt এর মাধ্যমে ।

রাগান্বিত দৃশ্যে লী যে কব, জুরি নম্বর ৩

আমরা জানি আইনের চোখ অন্ধ । আইন যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে প্রমাণে বিশ্বাস করে । একজন আসামী কি আসলেই দোষী না নির্দোষ সেটার যুক্তি সংগত কোন কারন ছাড়া আইন কখনো  কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না । মানুষ ভুল করে । কিন্তু এক সময় মানুষ ভুল স্বীকার করে যুক্তি মেনে নেয় । কারন যুক্তি-তর্কের মাধ্যমেই আসল সত্য বের হয়ে আসে । মাঝে মাঝে এমন কিছু বের হয়ে আসে যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই । চরিত্রের খোলসের ভিতরের অংশটুকুও বের হয়ে আসে । আসলে 12 Angry Men সিনেমার মূল বক্তব্যই হচ্ছে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সত্যের পরিচয় পাওয়া । সমাজে অহরহ অপরাধ ঘটে চলেছে । কিন্তু সব অপরাধেরই কি ঠিকমত সঠিক বিচার করে সঠিক রায় দেয়া হয় ??? নাকি ইচ্ছেমত মনগড়া কোন রায় দিয়ে দেই আমরা ? 12 Angry Men সিনেমাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে আমাদের সমাজের বিচার –ব্যবস্থার অসংগতিগুলি । অপরাধ যাই হোক না কেন সঠিক প্রমাণ এবং সঠিক যুক্তি দিয়ে সত্য বের করে সঠিক রায় দেয়াটাই আসল ব্যাপার ।

অভিনয়ের কথা বললে প্রত্যেকটা চরিত্রই অসাধারন অভিনয় করেছেন । ১২ জন মানুষ তাদের নিজ নিজ যুক্তি দেখানোর সময় তাদের কথা বলার ভঙ্গি , মুখের এক্সপ্রেশন, চেহারার রাগী ভাব সব মিলিয়ে জাস্ট অসাধারন । প্রত্যেকটা চরিত্রের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল ক্যামেরায় । তবে যার অভিনয়টা ছিল সব থেকে সাবলীল তিনি হলেন জুরি নম্বর আট যিনি সর্ব প্রথম একাই হাত তুলেন আসামীর পক্ষে । পুরো সিনেমা জুরে তিনি তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটুট । জুরি নম্বর আটে যিনি অভিনয় করেছেন তিনি হলেন ‘হ্যানরী ফোন্ডা’ । অভিনয়ের পাশাপাশি এই সিনেমার প্রযোজক হিসেবেও ছিলেন ‘হ্যানরী ফোন্ডা’ । একজন যুক্তিবাদী , এবং একজন জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিজেকে চরিত্রের জন্য একেবারে বিলিয়ে দিয়েছিলেন । তবে সিনেমার একদম শেষ পর্যন্ত জুরি নম্বর ৩ এ অভিনয় করা ‘লী জে কব’ এর অতুলনীয় অভিনয়ের কথাও ভুলতে পারবেন না । এক কথায় বলতে গেলে ১২ জনের সবাই নিজ নিজ চরিত্রে অসাধারন অভিনয় করেছেন । এই অসাধারন অভিনয়ের জন্য ‘হ্যানরী ফোন্ডা  ‘Best Foreign actor’ ক্যাটাগরিতে  বাফতা এ্যাওয়ার্ড পান ।

১ ঘন্টা ৩৬ মিনিটের এই সিনেমায় আপনি বোরিং ফিল করবেন না । সিডনী লুমেট একটি রুমের মাঝেই পুরো সিনেমা শেষ করে দিয়েছেন । সিনেমা দেখার সময় মনেই হবে না যে একটি রুমের ভিতর পুরো সিনেমা শেষ হয়ে গেছে । পুরো সিনেমাটিই সংলাপ নির্ভর সিনেমা । সিডনী লুমেট প্রত্যেকটা অভিনেতার কাছ থেকে যে নিপুণতা আর যে অভিনয়ের মাধুর্য নিয়ে আসেছেন তা সত্যই অতুলনীয় । সিনেমাটা একটি রুমের মধ্যে হওয়ায় ক্যামেরার অনেক গুলো ছোট ছোট শট নিতে হয়েছিলো । বড় শট তেমন ছিলো না । কারন একটি রুমের মাঝেই ক্যামেরা বার বার ঘুরে ফিরে বারো জনের দিকেই তাক করা ছিল । সংলাপ বহুল সিনেমার কারনে পরিচালক চেষ্টা করেছেন যেন প্রত্যেকটা চরিত্রের অভিব্যক্তি তিনি তার ক্যামেরায় ফুটিয়ে তুলতে পারেন ।  এবং

সিডনী লুমেট এ বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে সফল হয়েছেন । সিনেমাটি অস্কারে নোমিনেশন পেলেও শেষ পর্যন্ত অস্কার পায় নই । তবে অস্কার না পেলেও সিনেমাটি ‘golden bear award, OCIC award’ সহ আরো কয়েকটি পুরষ্কার লাভ করে ।

হ্যানরী ফোন্ডা, জুরি নম্বর ৮ চরিত্রে

পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই সিনেমাটি সম্পর্কে । সিনেমাটি শুধু একটি খুনের বিচার করার মাঝে সীমাবদ্ধ নয় , সিনেমায় ফুটে উঠেছে বারো জন মানুষের বারো রকমের গল্প । উঠে এসেছে মানুষের আবেগ , খোঁড়া যুক্তি আর নিজেদের গোঁড়ামির বিবেচনা । একজন মানুষকে না চিনে না জেনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা এতটা সহজ নয় । মানবিক দিকটাও ভাবতে হয় । সিনেমাটি আপনাকে ভাবাবে । আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন । সিনেমাটি দেখার পরে সমাজের এবং আইনের অসংগতি গুলো আপনাকে নতুন করে ভাবাতে সাহায্য করবে ।

২০০৮ সালে সিনেমাটি ‘american film institute’s list’ এ “কোর্ট রুম ড্রামা” জনরাতে টপ টেন অলটাইম গ্রেটেস্ট সিনেমার মাঝে  ‘২’ নম্বর পজিশনে জায়গা পায় ।

12 Angry Men সিনেমার উপড় ভিত্তি করে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ নাট্যোৎসব- ২০১৭” এর দ্বিতীয় সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হবে নাটক “12 Angry Men (1957 film)

ঢাকা ভার্সিটির নাট্যোৎসবে প্রদর্শিত 12 Angry Men (1957 film)

Comments

comments